গ্রামের নাম জামুন্না।
বগুড়া জেলার শাজাহানপুর উপজেলার আড়িয়া ইউনিয়নের একটি সবুজ-শ্যামল গ্রাম। এই
গ্রামেই বেড়ে ওঠা হালিমা খাতুন ১৯৭০ সালে পাশের বাড়ির আলিমউদ্দিন এর সাথে সংসার
শুরু করেন। বয়স ছিলো ১৬ বছর । দুজনের অনেক স্বপ্নে গড়া প্রেম আর ভালোবাসায়
তাদের বিয়ে হয় । তাদের বিয়ের কিছুদিনের মধ্য হালিমা খাতুন গর্ভবতী হয় । কতো
আনন্দ সবাই । ঘর আলো করে আসবে নতুন শিশু। দিন-দিন মাস যায় । হালিমা
খাতুন প্রথম সন্তাস পাঁচ মাসেই গর্ভপাত হয়ে যায়। সবার মন খারাপ। কিছু করার নেই
বলে সান্তনা দেন সকলে। আল্লাহ্ ভাগ্যে রাখেনি বলে সান্তনা আনেন হালিমা খাতুনের
স্বামী আলাউদ্দিন।
মাস কয়েক পর হালিমা
খাতুন আবার গর্ভবতী হয়। আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন সবাই। এবার নবজাতকের
পৃথিবীতে আসবেই। ভয়ে ভয়ে থাকে হালিমা খাতুন । মনে ভয়, সংশয়। জীবিত সন্তানের
মুখ দেখতে পাবে কী না তাই ভেবে।
আবারও... দিনকে-দিন, মাস
যায়। হালিমা খাতুন এখন ৬ মাসের গর্ভবতী। শরীর ভারী হয়ে আসছে। পরিবারের সবাই খুব
যত্ন করে, পুষ্টিকর খাবার দেয় । মোটেও ভারী কাজ করতে দেয়না। এভাবে কেটে যায় আরও
এক মাস। ৭ মাস চলছে। রেডিওর খবরে শোনা যায় পাঁকহানাদার বাহিনী বাংলাদেশকে
পাকিস্তানির দখলে নেওয়ার ফন্দি আঁটছে।
.
.
.
শুরু হলো স্বাধীনতার যুদ্ধ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সোনার দেশকে ধংস করতে তাণ্ডব শুরু করে। মানুষ হত্যা, নারী ধর্ষণ, শিশু হত্যা। হানাদার বাহিনী ঢাকার রাজপথ ধরে আসতে শুরু করলো জেলা শহরে। তার পর গ্রামে গ্রামে। চারপাশে শুধু গলা-পঁচা লাশের দূর্গন্ধ ছড়াতে লাগল। মানুষ কাজ কর্ম করতে না পারায় ঘরের খাবার শেষ করে অনাহারে জীবন কাটায়। গ্রাম কে গ্রাম আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সুন্দরী কিশোরীদের করেছে ধর্ষণ, শিশুদের গলাটিপে মেরে ফেলছে নরপিশাস এর দল। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়ে, ঘরবাড়ি হারিয়ে, ভিটা-মাটি হারিয়ে নিশ্য। নববধূ নতুন ঘর ভাঙেছে নরপিশাসের দল।
যুদ্ধে গিয়ে আর ফেরেনি
মায়ের কোলে দামাল যুবক। কত আশা, স্বপ্ন ভেঙে শেষ হয়েছে
১৯৭১ এর স্বাধীনতার যুদ্ধে! এসব কথা বলতে বলতে হালিমা খাতুন কান্নায় ভেঙে পড়েন।
একটু শান্ত হয়ে
কিছুক্ষণ সময় নিয়ে আবার শুরু করেন তার জীবনের গল্প ।
হালিমা খাতুন বলেন-
যুদ্ধের ডামাডোল হতেই আমার তখন ৮ মাস পাড় হয়ে ৯ মাস এ পড়ি আমার পেটের বাচ্চা
ঠিকঠাক আছে । আমি ও আমার স্বামী আশাবাদী আমরা সন্তানের মখু আল্লাহ দেখাবেন এবার।
আমাদের গ্রামের কিছু দূরেই বগুড়া মাঝিরা ক্যান্টনমেন্ট। শোনা যায় সেখান থেকে
পাকিস্তিনী হানাদার আসতেছে। গুলির আওয়াজ ও পাওয়া যায়।
গ্রামে ঢুকতে পারে লোকজন বলাবলি করছিল। মিলিটারি ঢুকবে বাড়িবাড়ি।
এমনি একদিন সন্ধার পর
গুলির আওয়াজ পাশের গ্রাম থেকে পাওয়া যাচ্ছে। আমরা সবাই দূরের জঙ্গলে লুকাতে যাই।
সারারাত কাটাই ঝোপের ভেতরে। সকাল হলে বাড়ি আসি। এভাবে। চলতে থাকে...
আমি ৯ মাসের গর্ভবতী।
দিন হয়ে আসে প্রসবের। নড়াচড়া করতে পারিনা তেমন, গা ভারি হয়ে আসছে। একদিন
সন্ধার পর কাছাকাছি গুলির বিকট আওয়াজ, সবে মাত্র ভাতের থালা থেকে মুখে ভাত তুলব,
এমন সময় আমার স্বামী হাত ধরে টানে তুলে পালাতে বলে। আমিও মুখের ভাত ফেলে দিয়ে
ছুটি জঙ্গলে। অন্ধকারে ছুটতে থাকি জীবন বাঁচানোর তাগিদে। কোন হুঁশ নেই। আমার পেটে
বেড়ে উঠা সন্তানের কথাও খেয়ালে ছিলো না। স্বামীর হাত ধরে শুধু ছুটছি আর ছুটছি,
জঙ্গল থেকে জঙ্গলে।
হঠাৎ আমার স্বামীর হাত
থেকে ছুটে যাই। একটা গাছের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ি মাটিতে । আমার ভারি দেহখানি মাটি
থেকে উঠার শক্তি আর হয়নি। ওখানেই পড়ে থাকি। আমার স্বামী পরিবারের সবাইকে খবর
দেন। ততক্ষণে নাকি আমি অচতেন হয়ে যাই। রক্ত দিয়ে ভেসে যায় মাটি। স্বপ্নগুলো
ভেঙে যায় নিমিষে। আমার বাঁচার সুযোগটাও নাকি কমে আসছিলো। বলতে বলতে চোখ ছলছল করে
ওঠে। এক সময় বাকরূদ্ধ হয়ে পড়েন হালিমা খাতুন।
হালিমা খাতুনের জীবনের
গল্পের পরের অংশে জানা যায়...
পরদিন সকাল বেলা তাকে
সদর হাসপাতাল নিয়ে যায়। তিনদিন পর হাসপাতাল চেতনা ফিরে পেয়ে
হালিমা খাতুন খোঁজে বেড়ায় তার সন্তানকে। দুঃখের বিষয় হলো সেদিন রাতেই হালিমার
পেটে বাচ্চা মারা যায়। ডাক্তার অপারেশন করে পেট থেকে মরা বাচ্চা বের করেন। অসহায়
হালিমা মিলিটারির তাড়ায় এবারও সন্তান হারা হন। সন্তানহারা হালিমা আবারও খালিহাতে
ফিরে আসে বাড়িতে।
এক সময় যুদ্ধশেষ হয়।
দেশ স্বাধীনতা লাভ করে। হালিমা খাতুন দুঃখ এখানেই শেষ নয় ।
দেশ স্বাধীন হবার কিছু
দিন পর স্বামী ওলিমুদ্দিন কঠিন পীড়ায় আক্রান্ত হয়। মারনাক্রান্ত টিবি রোগ। অনেক
ডাক্তার দেখিয়েও কাজ হয় না। খুব তাড়াতাড়ি কয়েক মাসের মধ্য মারা গেলেন
ওলিমুদ্দিন। এবার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেলো হালিম খাতুনের । মানুষ একজীবনে এত কষ্ট
আর সইতে পারে কেমনে?
হালিমা খাতুনকে বাবার
বাড়ি নিয়ে আসেন। অনেকবার বিয়ে দিতে চান পরিবার থেকে। কিন্তু হালিমা রাজি হননি।
স্বামীর ভালোবাসা ঘিরে আজও বেঁচে আছেন হালিমা খাতুন। ৫৩ বছর ধরে স্বামীর স্মৃতি
বুকে নিয়ে পাহাড়ের মতোন বেঁচে আছেন হালিমা খাতুন। ৭১ বছর বয়সে হালিমা খাতুন এখনও
হাঁটাচলা ফেরায় কোনো সমস্যা হয় না। শক্তি ও সামর্থে এখনও তরুণ্য তার শরীরে। এ এক
অন্যরকম ভালোবাসার সৃষ্টি।
দীর্ঘ জীবন ভালো থাকুন
হালিমা খাতুন। আমরা আপনাকে সেলুট জানাই...
0 Comments