কবি হোসেন দেলওয়ারের কাব্যগ্রন্থ হরিণনিদ্রার নাচ পড়ে ঘুরেফিরে একটি কথাই কেন যেন মনে হচ্ছিল : চিত্ররূপময়। এই নতুন সহস্রাব্দে কবি কবিতাতে রূপ ও চিত্রকে আয়ত্ব করলেও তাকে ব্যবহার করেছেন ভিন্ন কৃৎকৌশলে। এই গ্রন্থপাঠে আমাদের অভিজ্ঞতা ওতেই সমাপ্ত হবে না। তাই অগ্রসর হওয়া যেতে পারে এবং প্রথম কবিতাটিই পড়া যেতে পারে, কেননা প্রথম কবিতাকে গ্রন্থের প্রবেশক বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে :
মনে হয় পুষ্পভারে আছি,
জগৎ-জঞ্জাল
প্রজাপতি শীর্ষরোদে রেখে এইমাত্র যে পাখিটি উড়ে গেল
তার ঠোঁটে শুরুর সঙ্গীত
তার ছায়া উড়ে উড়ে ছায়হীন হয়ে গেলে
মেঘদ্রাঘিমায় জলের সংকেত খুঁজে পায়
তবু জল ছুঁয়ে যে বালক তৃষ্ণাতীর ছুঁড়ে দেয়
নির্বাণের আগে তার চোখে খেলা করে অলৌকিক রোদ
তখন নবীন কোনো কাকতাড়ুয়ার
অভিষেক-ঘণ্টা বেজে ওঠে
অভিষেক-নাম্নী এই কবিতাটি পাঠ করতে গিয়ে পাঠক লক্ষ না
পারবেন না যে, এতে চিন্তার সরলরৈখিক ধারাবাহিকতা নাই, কবিতার শেষে দাঁড়িও নাই। এছাড়া
শীর্ষরোদে, মেঘদ্রাঘিমা, তৃষ্ণাতীর শব্দগুলো অসম্ভব বা বিস্ময় জাগানিয়া না হলেও কবিতার
আবহাওয়ার সাথে মিলিয়ে অন্যরকম অনুভূতি জাগায়। কবিতায় পুষ্পভারে থাকার ও জগৎ-জঞ্জালের অনুভূতি
যে বর্ণনা করে তাকে এরপর দেখি, উধাও। কিন্তু
শেষেকাকতাড়ুয়ার অভিষেক ঘণ্টা বাজার কথা বললে, তার ছদ্মবেশ বোঝা যায়। তখন
পাঠকের মনে হতে পারে কথকই তৃষ্ণাতীর ছুঁড়ে দেয়া বালক; তারই শেষ অভিজ্ঞাতার ভবিষ্যদ্বানী
হচ্ছে, নির্বাণের আগে তার চোখে খেলা করে অলৌকিক রোদ। ফলে কবি
রচনা করছেন তার অভিষেক, রচনা করছেন ভবিতব্যও— আসলে চিরকাল
কবিই নিজের ভবিষ্যদ্বক্তা।
পুষ্পভারে থাকার অভিজ্ঞতা এই গ্রন্থে অচিরেই
রূপান্তরিত হয় নিদ্রাভারে।
আমরা ঘুমকুয়াশার দিন-৩ নামের কবিতায় এসে
সেই বয়ান পাই; কবি বলেন :
বুঝি নিদ্রাভারে আছি
অবারিত এই জলে জলের সংসার
লহুর নিনাদে কাঁপে নিদরাঙা পাখি
আমরা অচিরেই বুঝে যাই, যেতে থাকি কবির চৈতন্যে তন্দ্রা,
ঘুম, মৃত্যু, পিপাসা ক্রমাগত মুখোশ বদল করছে। রৌদ্র
তাই কারাগার হয়ে উঠছে।
রক্তের ভেতরে তাই উন্মাদনা বা উদ্যমের
কথা নয়, বরং ধ্বনিত হচ্ছে এক পাখির কথা যে কিনা ঘুমের রঙে রাঙানো। যেন
অপেক্ষা কবে তন্দ্রাদেবী তার নিমীলিত চোখ থেকে খুলে দেবে ঘুমের পারদ। যেন আকাঙ্ক্ষিত শুধুই
ঘুম, আর কিছুই নয়— এই ঘুম মৃত্যুর ছদ্মবেশই বটে। কবি
জীবনানন্দ দাশের অন্ধকার কবিতার কথা মনে পড়তে পারে আমাদের, যেখানে অন্ধকারের স্তনের
ভিতর, যোনির ভিতর অনন্ত মৃত্যুর মত মিশে থাকবার কথা আছে। আর এখানে
কবি তার সেই নিদ্রার মুহূর্তকে রচনা করছেন: পায়রা উড়াল
অবশেসনের রাতে / আরো কিছুক্ষণ শঙ্খধ্বনি বেজে যাবে। এক চমৎকার
মানবিক অনুভূতির বয়ান বলা চলে একে। অন্যদিকে জীবনানন্দ দাশ তাঁর
কবিতায় যেন উত্তীর্ণ হতে চাইলেন প্রকৃতিলীন এক মহাসত্তায়। এখানেই
কবি হোসেন দেলওয়ারের বিশেষত্ব। আর পায়রা উড়াল অবশেসনের রাতের কাব্যিক
অভিঘাত আমাদের তার অনুভূতির ও দেখার জগতের প্রতি আরও বেশি উৎসুক করে। ফলে
এই কবির যে কবিতার ভেতরেই প্রবেশ করি ঐ অভিঘাতকে বহন করেই প্রবেশ করতে চাই যেন। ঘুম
হোসেন দেলওয়ারের কবিতায় এক বিশেষ স্নায়ু যেন, যার আছে নানান মাত্রিকতা, কেবল মৃত্যুবোধ
নয়। একে পার হয়ে জীবনের আকাঙ্ক্ষাও
প্রবলতা পেয়েছে কোথাও :
ঘুম কিংবা জাগরণে তন্দ্রাসেতু পার হয়ে
বাসুদের বাড়ি যাই
ফিরে আসি
[তন্দ্রাজ্বরে]
কবি যদিও একদিন প্রাণের মুনিয়া উড়ে যাবে জানেন, তবু
নিঃসঙ্গ রোদের কাছে তার ফিরে আসবার প্রতীক্ষাই করেন। এই আকাঙ্ক্ষা জীবনের; আর যেহেতু জীবন, সেহেতু পিপাসা সেখানে আছে। পিপাসার
এই অনুভূতি ঘুমের ভেতরেও ফুরোবার নয়। জীবন অনুভবের সমগ্রতাও কবি
ধীরে ধীরে উন্মোচিত করেন এভাবে।
তাই বলতে পারেন : ঘুমজলে ভেসে থাকা সব
ফাঁদ অপরূপ অভিন্ন কৌশলে।
কবি হোসেন দেলওয়ারের জগৎ— যুগপৎ দেখার ও অনুভবের জগৎ। এই অনুভব কখনও শুধু দেখার
মুগ্ধবোধেই সমাপ্ত; কখনও প্রবেশ করে আরও অন্তর্লীন চৈতন্যে যেখানে দৃশ্য ভেঙে ভেঙে
রঙ ও ঘ্রাণ স্মৃতি ও বর্তমানে তথা জীবনে মিশে যেতে থাকে। তাই ময়নামতির
সেমেট্রিতে এসে তার একে এক অলৌকিক জোছনার নগরী মনে হয়। কবি দেখেন,
সেমেট্রি জুড়ে ফুটে আছে শত জবাতারা, শহীদের রক্তে লাল অভেদ আল্পনা— যেন এক নক্ষত্রবাগান।
তার কাছে উন্মোচিত সহসা এক রক্তবেণী মালঞ্চের
সিঁড়ি। জল
তাই তার কবিতায় আবহমান কবিতার মতোই জীবনের প্রতীকই হয়ে ওঠে। আমরা
পাই জলের সংসার-এর মত শব্দ, পাই:
কথার ভেতরে থাকে কিছু জল
জলের ভেতরে জমা থাকে কিছু কথাকোলাহল
[সমুদ্রবণিক]
কিংবা জলডাকা রাতের কথা, সমুদ্রের দিনের কথা। কিন্তু
সমুদ্র তো শুধু জল নয়, লবণেরও উপাখ্যান, নাবিকতার পিপাসা। যতই লবণজাহাজ
ডুবে যাক লবণজলের ঘ্রাণে সমুদ্রবণিকের চোখ গাঢ় হয়। শীতের
বন্দরে বেদনাঘুঘুর দিন ডেকে ওঠে, ডেকে ওঠে সমুদ্রের রাত। মরে যাওয়া
ঢেউয়ের মাতাল সুরভি নিয়ে শীতপাখি উড়ে আসে। যেন এক
ভ্রমণের আমন্ত্রণ আসে কবিতার ছদ্মবেশে। কিন্তু শুধু ভ্রামণিকের ভঙ্গী
কবির নয়:
ভ্রমণের কাঙ্ক্ষা নিয়ে যারা আসে নিখিলের বনে
তারা সকলে অলখে তুলে নেয় সংশয়-পালক
[বিষাদপুষ্পের নদী]
আমাদের মননে মজ্জায় মিশে থাকে তুষারের দাহ, আর তার কথা
কবি বিস্মৃত নন, যদিও ভ্রমণ-পিপাসু চোখ নিয়ে উঠে এসেছেন জলপাই পাহাড়ের পারে মেঘ আর
রোদ্দুরের মোহ নিয়ে।
এই সেই কাব্যগ্রন্থ, হরিণনিদ্রার নাচ— যেখানে দূর বনগ্রামে বনময়ূরের ডাকে মেঘ জমা হয়, সান্দ্রটিলা ছুঁয়ে নেমে
আসে নিশিঝর্ণা, বাতাবিলেবুর ঘ্রাণে অন্ধগলি খুলে যায়— যার কবি হোসেন দেলওয়ার, আমাদের মুখোমুখি করান এহেন অভাবিত অভিজ্ঞতার। এক
বিমর্ষতার, নীরব ও মুগ্ধ বেদন-বিহ্বলতার আখ্যান এই গ্রন্থ যেখানে দৃশ্যসকল নিজে নিজেই
রচিত হতে থাকে, উচ্চ- চিৎকারমথিত প্রহরের আড়ালে। যেন কবি
নিজে সেসব দেখতে পান অথবা পান না।
তথাপি মনে হয়, এর ভ্রমণপথ খুব বৈচিত্র্যময়
নয়। জল,
মেঘ, সমুদ্র, নদী, ঘুম, কুয়াশা এমন কতগুলো প্রসঙ্গেই যেন ঘুরপাক খাচ্ছে। না
গোলোকধাঁধাও তৈরি হয় নি।
অবশ্য বলে নেওয়া যেতে পারে তিনটি অংশে
বা পর্বে বিন্যস্ত এই বইটির প্রথম পর্ব ‘অভিষেক’ যার কেন্দ্রউপাদান জল, পরবর্তী অংশ
‘ঘুমকুয়াশার দিন’ যার নিয়ন্ত্রক ঘুম ও কুয়াশা, আর শেষপর্ব ‘হরিণনিদ্রার নাচ’। শেষপর্বে
উভয়পর্বের ভাবপ্রপঞ্চগুলো উপস্থিত ও প্রভাবসঞ্চারী হলেও কিছু বৈচিত্র্যও আছে।
আগেই উল্লেখ করেছি, কবি হোসেন দেলওয়ার জল, মেঘ, ঢেউ, নদী, সমুদ্র, পাখি, জ্যোৎস্না,
ঘুম, কুয়াশা এসব উপাদানকে বার বার ব্যবহার করেছেন। এই বার বার ব্যবহার তার রচনাকে পুনরুক্তিময়
ও ক্লিশে করে তোলে নি।
কারণ, রচয়িতা এ বিষয়ে হুঁশিয়ার ছিলেন। যেমন
: নদী শব্দটির দিকে যদি তাকাই দেখি এটি এতবার এতভাবে এসেছে যে, মনে হয় যেন কবির কল্পনা
এই বইয়ে নদীমাত্রিক হয়ে উঠেছে। যেমন :
১. কুয়াশাবাগানে ঢুকে যায় একা প্যারাবোলা নদী
[নদী ফেরে না]
২. সম্মোহিত
নদী জানে
ডুবোচরে শুধু জলবালিকার দুঃখ ভেসে থাকে
[ঘুঙুরের নদী]
৩. মঠ শুধু অদৃশ্য সুতোর টানে খুলে রাখে ঘুঙুরের নদী
[ঘুঙুরের নদী]
৪. জলডাকা রাতে সাঁতার জানে না নদী
[সাঁতার জানে না নদী]
৫. বালিকার হিমঘরে বয়ে যায় ঘুমকুয়াশার নদী...
[ঘুমকুয়াশার দিন - ৯]
৬. মাছিমপুরের থেকে উঠে আসে মাছিদের নদী
[হরিণনিদ্রার নাচ]
৭. বিষাদপুষ্পের
নদী ছুঁয়ে গেলে বনময়ূরের লেজ
নিশিপ্রেত সরে যায় দূরে,
[বিষাদপুষ্পের নদী]
৮. হিমসরে ভেসে যায় শাদা যত পালকের নদী...
[নিশিঝিরি]
অনেকগুলো উদাহরণ দেওয়া গেল, তবু কিছু বাকি রইল। এই
পঙ্ক্তিগুলোতে নদীকে কতভাবেই না ব্যবহার করেছেন কবি, আমার মনে হয়েছে এর অনেকগুলো বেশ
চমকপ্রদ। এই পাঠে সহজেই চোখে পড়ে কবির ভ্রামণিক ভঙ্গি। দৃশ্যকল্প
তৈরির প্রবণতা। হরিণনিদ্রার নাচ-এ কবির কল্পনা আবর্তিত হওয়ার যে উপাদানগুলোর
কথা আগে উল্লেখ করেছি তার দিকে তাকালে বোঝা যায় নৈসর্গিক আবহ এর মর্ম-উপাদান। কবিতা
বা কবির জন্য এটি দুর্বলতা নয়, কেননা এটিকে লেখক সামলেছেন দক্ষতার সাথে। যে
নদীদের এই বইয়ে পাই, তারা অন্য কোনো কবির কাব্য থেকে উঠে আসে নি। এই
কবির অন্য উপাদানগুলোর ব্যবহারের দিকে মনোযোগ দিলে দেখি, এদের রচনায় নতুনতা আছে :
ঘুম :
১. ভেঙেছে
ঘুমের নূড়ি
২. আজ রোদ ফেরি করি চাঁদের আশ্রমে।
[ঘুমকুয়াশার দিন -১]
৩. ঘুমজলে ভেসে থাকা সব ফাঁদ অপরূপ অভিন্ন কৌশলে
[ঘুমকুয়াশার দিন -২]
৪. লহুর নিনাদে কাঁপে নিদরাঙা পাখি
[ঘুমকুয়াশার দিন -৩]
৫. তন্দ্রাদেবী
তার নিমীলিত চোখ থেকে
খুলে দেবে ঘুমের পারদ
[ঘুমকুয়াশার দিন -৩]
৬. আজ রাত বিরহ-বিষাদ ঘুমবালি উড়ে যায় দূরের সৈকতে...
[ঘুমকুয়াশার দিন -১০]
৭. আমার
চোখে যে হরিণনিদ্রার নাচ
৮. তার বৃন্তে বসে থাকো তুমি
[হরিণনিদ্রার নাচ]
পাখি :
১০. নদী কিছু পাখি-ছায়া মনে রাখে
[ঘুঙুরের নদী]
১১. রৌদ্রদিনে
যে সব পাখিরা উড়ে আসে
তাদের পালকে প্রত্নসমুদ্রের হাওয়া
[সমুদ্রবালিকা]
১২. মেঘ শুধু পরাজিত পাখিদের সাথে প্রতারণা করে
[সীতারাম ছুঁয়ে দিলে]
১৩. রাতের টানেলে জ্বলে পাখি-আলো
[ঘুমকুয়াশার দিন -৬]
১৪. গ্রহণের কালে ভুল করে ডানা ঝাড়ে পাখি
[অখ্যাত
ধুলোর দিন]
বিভিন্ন বিষয় ধরে আরও উদাহরণ দেওয়া যেত। সে যাই হোক, এই উদাহরণগুলোর সূত্র ধরে আমরা কবির রূপক ও চিত্রকল্প তৈরির দক্ষতার একটা পরিচয় পেয়ে যাই। এই পরিচয় এর আগের বিভিন্ন উদ্ধৃতিতেও স্পষ্ট। আমাদের মনোযোগের বিষয় হচ্ছে, একজন কবি পুরোনো এই পাখি, নদী, জল, ঘুম এসবকে কেমন করে ব্যবহার করেন। আমার মনে হয়েছে শব্দ প্রয়োগের বিশেষ নৈপুণ্যে এক নতুন আবহ পেয়েছে এই উপাদানগুলো। অক্ষরবৃত্তের এক খোলা চালে লেখা হোসেন দেলওয়ারের এই কবিতাগুলোর বিশেষত্ব হচ্ছে এর চিত্রময়তা, যা বিচ্ছিন্ন রেখার টানে আঁকা। ভাবের ছোট ছোট ছেদ দিয়ে রচিত। এই বিষয়টিও কবিকে পুনরুক্তিপ্রবণ ও ক্লিশে হওয়ার থেকে রক্ষা করেছে। প্রথম দশকের কবিতার এই বিশেষত্বকে সাঙ্গীকৃত করায় নিসর্গচিত্র কেবল বর্ণনায় পর্যবসিত হয় নি, অনুভবে উত্তীর্ণ হয়েছে। এখানেই দীর্ঘ বিরতির পর কবির কবিতায় ফেরা সার্থক হয়েছে, কেননা পুরাতনের পথে নয় বর্তমানের জল ও হাওয়াকে আত্মস্থ করে নবীন কবিতাই লিখতে পেরেছেন তিনি। ফলে, বিশ্বাস করি এই প্রথম গ্রন্থ-অভিযানে তিনি সেই পাঠককে সঙ্গে পাবেন, যে পাঠকের অনুভব বনময়ূরের ডাকে জমা হওয়া মেঘের কাছাকাছি।

0 Comments