ধ্বংসের বিপ্রতীপে সৃষ্টি কিন্তু মাটিতে প্রথিত কাব্যবীজ আর সেই বীজ হলো স্বয়ংক্রিয় ভ’মি মাইনের মতো বারুদে ঠাসা। মাটির ধরণ পলি আর বালির মিশ্রণে দোআঁশ। ভসকা মাটি হতে যে-কোনো টাইম বিস্ফরণ ঘটা অমূলক নয়! হ্যাঁ, কবি ঋজুর কবিতার আকার প্রকার ও বহিস্বরের কথা বলছিলাম। অগ্রজ তথাপি তিনি বন্ধবরেষু কবি ঋজু রেজওয়ান।
কবিতায়- তার ম্যাথেমেটিক্যাল কনফ্লিক্টের সহজ দ্বিঘাত সমীকরণের প্রায়োগিক নিক্ষেপণ পরখ করে বোদ্ধাগণ হয়তোবা নিছক গিমিক ভাববেন, কিন্তু আদপে তাতো নয়-ই, বরং এই কবিতাগ্রন্থ একটা বোধিগুল্ম। এই বোধিগুল্মেও বোধিসত্ত্বাবৃত সাবুজিক তাজা শাখা প্রশাখারা গানিতিক শুভঙ্করের ক্লেভারেন্সকে অতিক্রম করে প্যারাডাইমে এসে শেষ হয়েছে। আবার কখনও প্যারাডক্সে এসে যবনিকাপাত ঘটেছে।
পক্ষান্তরে, কখনও বা কবির অস্থির খেয়ালে সোশ্যালট্যাবুর চিৎপটসহ মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে চাঁছাছোলাভাবেই। এ ক্ষেত্রে কবি ছন্দ প্রয়োগে আসুরিক প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন বারবার। আমার স্মৃতিশক্তি বিট্রে না করলে আমি খুব সম্ভবত সর্বাগ্রে বিনয় মজুমদার ও পরবর্তীতে এই দেশের অরবিন্দ চক্রবর্তী, অপু মেহেদি, দুর্জয় খান ও আনিফ রুবেদের কবিতায় ম্যাথেটিক্যাল ও ফিলজফিক্যাল এসেন্স পাই। যাকগে মোর্দা কথাই আসা যাক...
শিম্বসকারের ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত ‘ইন ফেইজ অব ফিলিং ব্যাড অ্যাবাউট ইউর সেল্ফ’ নামক কাব্যগ্রন্থে বিপ্রতীপতা সম্পর্কে লিখলেন তো একটু পড়ে নেয়া যাক অবগতির জন্য...
The buzzards never says it is to blame
The panther wouldn't what scruples mean
When the strike, it fells no shame
If snacks had hands. Theye'd Clame hands we're clean.
... এর অনুবাদ আপাততঃ করছি না। এটার অনুবাদ করব সামনের কোন এক সময়ে পড়বেন বন্ধুরা। ওয়ান লাইন বিবার্তা নিউজ পেপারে আমার বেশ কিছু অনুবাদ কবিতা আছে ওখানেই পড়ার দরখাস্ত রইল।
কবি ঋজু ভাই কবিতাকে নীরিক্ষা করেছেন দারুণ বিজ্ঞানমস্ক মুন্সিয়ানায়। কবি মিশলন হোলুব বিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে কবিতাকে রেখেছিলেন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের স্লাইডের ওপর। ভাষার ক্ষূদ্রাতিক্ষুদ্র শব্দবন্ধ নিয়ে ছেদ-ভেদ-দীর্ণ শেষে তৈরি করেছেন শব্দবীজ। তার কর্ষিত কবিতাভূমিতে শব্দবীজ চাষাবাদ একেবারেই আধুনিক তদুপরি সাইন্টিফিক ধাঁচের। আসলে ঋজুর কবিতাও সাইন্টিফিক লিরিকাল মেনাঙ্কলিতে ভরন্ত। যদিও এক নিস্ক্রিয় নির্বীজ শূন্যের ভেতর কবি অশ্বারোহী হয়ে ছোটেন আর এক্সেপেরিমেন্টাল কবিতা রচেন। কোনটিতে আবার নিগূঢ় সলিডারিটি ও ভাস্ট উইন্ডারনেশসহ সাবঅলটার্ন টার্ম আছে।
কবির অত্র কবিতাগ্রন্থ থেকে আমি একটি কবিতার চরণামৃত উল্লেখ করার তাগিদ অনুভব করছি- যত্রতত্র মেটাফরের বিরক্তিকর উপস্থিতি নেই বললেই চলে ঋজুর কবিতায়; তবে গানিতিক এলগরি আছে। সিকুয়েন্স ও টুইস্টও আছে! ফ্রয়েডিয় সাইকোলজিক্যাল আভা আছে! আছে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের রিদমিক রিফ্লেকশন। শেষ অবধি তিনি শূণ্যেকে ধরার প্রকৌশল বাতলে দেয়ার চেষ্টা করেছেন।
এই চেষ্টার রশদ নিতে যেয়ে খুবসম্ভব এই কবিতাগ্রন্থে দুর্ভাগ্যবশত তিনি লোকায়েত দর্শনসহ প্রাচ্য দর্শনের সুলুক সন্ধানে মেতে উঠেছেন। সাইন্সের সঙ্গে সুফিজমকে সাবকনসাস মাইন্ডে এনে প্রয়োগের ক্ষেত্রে দর্শন-বিজ্ঞান একাকার হয়ে ভজঘট না হয়ে দারুণ সুপেয় হয়ে উঠেছে। এই ঝটিকা আহার গেরিলা বিহার সদৃশ্য কবিতাগ্রন্থটি কিন্তু দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ ও সুফিজমের সাথে মিশেল করা খামিরের কাব্যিক ইনহেরেন্ট টেক্সটে এসে কতটুকু ইনকনসিসটেন্ট বস্তবাদ ও সুফিবাদে... এই প্রশ্ন অবান্তর নয়!?
এটা একান্তই কবির পারসোনাল চয়েস। তবে চিরায়ত এইসব দর্শন অমল মানুষের বোধে স্পর্শ করে বটে। শেষার্ধে বলি, সুফিজম যেভাবে উপস্থাপন করা হলো তার ‘সম্পর্ক’ কবিতায়--
“সর্ম্পকের বিবর্তন! বর্তন মানুষ--
তন্ন তন্ন করে
খেয়াতরি বায়”
এই কবিতারই শেষ চরনে তিনি বলছেন---
“আমারই স্থির বলয়ে
অদৃশ্যে... তোমার আপেক্ষিক রুপান্তর।”
অদৃশ্যে আপেক্ষিক রুপান্তরের বোধিসত্ত্বতে সাইন্টিফিক অজ্ঞেয়বাদ ও সুফিজম, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ হতে লালন, বুদ্ধ ও লোকায়েত চার্বাক দর্শনের ইশারা দিয়ে ভাবনার প্যানারোমায় আরেকটি পঞ্চভুজাকার ভাবনা সৃষ্টি করে দীর্ঘক্ষণ ঘোরাবৃত করে রাখে কবি।
‘স্যাপিওসেক্সুয়াল’ কবিতায়- কবি ফ্র্রয়েডের চেয়েও তুঙ্গ কাপালিক। এমনকি প্লেটোনিক লাভকে তিনি চাঁছা কথায় অতিক্রম করলেও ফ্রয়েডিয় কৌশল অবলম্বন করলেন অত্যন্ত পরিমিতিবোধের সঙ্গে। আবার ‘জাফলং’ কবিতায়- কবি প্রাচীন নবীন দ্বন্দ্বের যবনিকাপাত করলেন মেলোড্রামাটিক মনোলগে।
‘জাফলং’ কবিতার একটি লাইনে কবি নিজেকে ভূমিপূত্র বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেন তার বাচনিক বিভঙ্গে। শুরুতে... কবি বলছেন, “পাথর বলছি” ---এখানে পাথর হলো এলগরি; আদপে কবি তখন বাস করছিলেন প্রাগৈতিহাসিক পাথুরে যুগে। হঠাৎই বিস্ফরনের মতো বলে ফেললেন একটি বাক্য--- নবীন প্রাচীন দ্বন্দ্বে দোলার অর্বাচীন দুলুনীকে পরিস্কার করা কবির সরল সেই স্বীকারোক্তি--- “আমি প্রাচীন হয়াম”
এই ধরণের কবিতা সম্পর্কে দেরিদা কী বলছেন শুনি তবে...
এন্টিকো ও অন্টলজিক্যাল পার্থক্যকরণ করতে যেয়ে দেরিদা বলছেন, “অহহব লেখা ডিফারেন্স ও স্বকীয়তায় ভর করে নির্মিত। এই বর্ণটি বেশ কিছুদিন হতে ফরাসি অভিধানে দোর্দন্ডপ্রতাপের সঙ্গে দাপিয়ে বেড়ায়। অহহব এর প্রায়োগিক ক্যারিটারিয়াতে ফরাসিতে ওহম অঙ্গের বিভক্তির সক্রিয় অভাবে সোয়োমটো এটা। ফরাসি অভিধানবিজ্ঞানে প্রবেশ করেছে বটে। মোটাদাগে স্থুলতারও দুটো এবাদতখানা আছে, সেটা প্রথমতঃ সব আকরের কবিতাবীজকে ধারণ আর অন্য সাহিত্যকর্ম থেকে ডিফারেন্ট এই পার্থক্যকরণ”।
ঋজুর বিপ্রতীপতা (±) হাইটেক বাই ফোকাল পড়ে পৃথকতা ও স্বকীয়তার দুরন্বয় টেনডেনসি আর প্রাগৈতিহাসিক মিথিক্যাল কনফেশন্স যাকে কিঞ্চিৎ ব্যাখ্যা করে হারিয়ে গেলাম গহীনে একেবারেই হৃদ অলিন্দে।
কবি ঋজু রেজওয়ানকে পাঠ্যতে রাখুন বন্ধুরা...

0 Comments