ববির মনটা আজ ভালো নেই। ক্লাস শেষ করে বাসায় আসতে বস্তির গলি থেকে হিরোখোর টুটুল ববির সাথে অপূর্বকে দেখে পথ আগলে নানান খারাপ কথা বলেছে। ভয় দেখিয়েছে অপূর্বকে। ভবিষ্যতে ববির সাথে অপূর্বকে দেখলে দুইজনেরই খবর আছে। অপূর্ব ববির বয়ফ্রেন্ড।
প্রাইভেট ইউনিভার্সসিটিতে পড়ে আর ববি ইন্টারমিডিয়েট পড়ে। এজন্যই ববির মন খারাপ। জানালার পাশে বসে বসে এইসব ভাবনায় মনে উদয় হচ্ছে তার। বস্তির মেয়ে বলে আজ তার এতো সমস্যা। জন্মই যেন পাপ। এই সমাজের মানুষ একটা দরিদ্র পরিবারের মেয়েকে কিভাবে নির্যাতন করে সেটাই বাস্তব চোখে দেখে আসছে ববি। তার বয়স ১৭ বছর হলেও অনেক কিছুই বোঝে। অভাব তাকে বুঝতে শিখিয়েছে। সে বোঝে, আমরা অনেক গরিব। চাইলেও অনেক কিছুই পাওয়া যায়না। গরীবের আবার সখ-আল্লাদ। যেমনটি বয়ফ্রেন্ড অপূর্বর সাথে সম্পর্ক তার। মাঝে মাঝে নিজেকে ভাবে, অপূর্বর সাথে সম্পর্ক আর ছেলেবেলার কানামাছি ভোঁ ভোঁ খেলা একইকথা। কারণ অপূর্বরা অনেক ধনী। কোথায় অপূর্ব আর কোথায় আমি। তেলে জ্বলে কখনও মিশেনা। বস্তির এই রেল স্টেশনের পাশে বাস করতে গিয়ে হিরোখোর টুটুল ও তার সাঙ্গ পাঙ্গদের কাছে কাছে এইটুকু বয়সে কতো খারাপ কথায় না শুনতে হচ্ছে তার। আবার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভাবে কেনই বা বলবেনা, এখানে কে আছে আমাদের; যে আমার হয়ে কথা বলবে। আমরাতো এই বস্তির উদবাস্ত। ববির বাবার বাড়ি কুষ্টিয়া অঞ্চলে, জীবনের তাগিদে আজ সে ঢাকায়। সংসারে তিনবোন এক ভাইয়ের মধ্যে ববিই বড়। ববির বাবা রহমত রিকসা চালায়। অভাবের সংসার। রহমতের রিকসা উপর সংসারের সকল খরচ তারপরও ছোট মেয়েটার হাপানীর সমস্যা ঔষধ আর ডা.লেগেই থাকে। সংসারের এই ঘানি টানতে হিম-শিম খেতে হয় রহমতকে। তাইতো রাতদিন রোদ-বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে হাড়ভাঙ্গা পরমশ্রম করে। এদিকে ববিকে অর্পূবর সাথে দেখার পর থেকেই টুটুেলর মাথা ওলট-পালট হয়ে আছে। টুটুল ভালোবাসে ববিকে। বয়স আটত্রিশ, দেখতে অদ্ভুত হতে পারে, নেশা করে তাতে কি হয়েছে, ববিকে সে একদিনের জন্য হলেও বিয়ে করতে চাই। ভোগ করতে চাই ববির অল্প বয়স্ক কোমল দেহখানিকে। কারণ এই বস্তির কোন মেয়েই এত সুন্দর ভাবে আকৃষ্ট করতে পারেনি তাকে। ভিতরে ভিতরে ববিকে কাছে পাওয়ার যৌন কামনা-বাসনা তাকে আরো মাতাল করেছে। ববির কলেজে যাওয়া থেকে শুরু করে ফিরে আস পযর্ন্ত সাঙ্গ-পাঙ্গ দিয়ে গোয়েন্দা লাগিয়েছে সে। ববি গত দুই-তিন দিন কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দিয়ছে। বাবা-মাকেও কিছু বলেনি যে মিছে মিছে ঝামেলা আরো বাড়বে। টুটুল আরো ক্ষেপে যাবে অবশেষে তার কলেজে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে যাবে। ববির বাবা আজ সকালে রিকসা নিয়ে বেড়িয়ে যাওয়ার সময় বলল মা তোমার কলেজ কি বোন্ধ? আজ কয়দিন কলেজে যাওনা নাহি তোমার মায়ে বোলছিলো। না বাবা বন্ধ না আজকে যাবো। ঠিক আছে মায় ভালো কোরে পড়বা, কলেজের স্যার ও মানষে যেন ভালো কয়। ববি আজ কলেজের ক্লাস শেষে অপূর্বর সামনে যেয়ে নীরবে মলিন মুখে দাড়িয়ে থাকে। অপূর্ব বুঝতে পেরেছে ববি তাকে লজ্জ্বায় এড়িয়ে যাচ্ছে সেদিনের ব্যবহহারের জন্য। অপূর্ব পাশে বসিয়ে ববির মনটা ভালো করে। দুজনে সিদ্ধান্ত নেয় যে কষ্ট করে আরো কিছুদিন এইভাবে তারা চলবে ও ভালো করে পড়াশোনা করবে। ববির ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ হবে সেই সঙ্গে সাবালিকা হবে আঠারো বছর পারকরে। তারপর তারা দুজন কোর্টে গিয়ে বিয়ে করে চলে যাবে অনেকদূরে। যেখানে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিয়ে অচেনা এক শহরে বাস করবে দুজন। যেখানে তাদেরকে কেউ চিনবেনা। থাকবেনা টুটুলেরমত কোন মানুষ নামের পশু। খুজে পাবে না অপূর্বর বাবা তাকে। কারণ অপূর্বর বাবা শুধুই টাকাকে চেনে। সে কোনদিন এই সম্পর্ক মেনে নেবে না। কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার সময় গলির মাথায় টুটুল তার সাঙ্গ-পাঙ্গ নিয়ে পথ আগলে দাড়ায়। টুটলকে আজ হিংস্র জানোয়ারে মত দেখাচ্ছে। সিগারেট টানে আর বলে পীড়িতের নাগর পাইছো, আমার কথা কানে যায়না, তোকে বোলছিনা ঔই ছেমড়ার সাথে মিশবিনা। আমি তোরে বিয়ে করমু, বেশি দেমাক দেখাবিনা। হাত ধরে টানা হেচরা করতে থাকে আর বলে আজকের পর থ্যাইকা যদি ঔই ছেমড়ার সাথে দেখছি তাহলে কিন্তু দুডোরই শেষ কইরা দিমু। আশে পাশের মানুষ শুধুই তাকিয়ে দেখে এরকম একটা মেয়েকে প্রকাশ্যে উত্ত্যক্ত করছে কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করছে না। এবার ববি আর নিজেকে সামলাতে পারলোনা। নিজেকে বাঁচাতে রাগে-ক্ষোভে হাত থেকে বইগুলো ফেলে দিয়ে ঠাস ঠাস করে দুইটা থাপ্পর বসিয়ে দিলো। হাতটা হেচকা টান দিয়ে নিজেকে মুক্ত করে মুখে ওর্ণা ধরে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে পালিয়ে গেল বাসার দিকে। মেয়ের সাথে টুটুলের এরকম ব্যবহারের কথাশুনে নির্বাক হয়ে যায় ববির বাবা-মা। এর আগেও কয়েকবার বস্তির লোকজন দিয়ে রহমত টুটলকে বলেছে তাতে কোন লাভ হয়নি। বাবা হয়ে মেয়েকে এখন গলাটিপে মেরে ফেলা ছাড়া কোন উপায় নেই। রহমত রাতে বউয়ের সাথে পরামর্শ করে ঠিক করল সে থানায় গিয়ে পুলিশকে বলবে এইসব কথা। মামলা করবে টুটুলের নামে। পরদিন রহমত সকালে মেয়েকে কাছে বসিয়ে বললে মায় তোমার কোন চিন্তা নাই। আমি দেখচি কোনডা করা যায়। রিকসা চালিয়ে সকাল নয়টার দিকে থানায় গেল রহমত। পুলিশের কাছে বলতেই এসআই বলে উঠলো ও টুটুল। টুটুল একটু খারাপ আছে, নেশা-টেশা করেতো। মামলা করতে হলে টাকা লাগে। এবার রহমত ঠিকই বুঝতে পারলো টুটুলের সঙ্গে পুলিশেরও যোগ সাজেশ আছে। পুলিশ জানে টুটুল নেশাখোর খারাপ তারপরও কিছু বলেনা। রহমত উপায় অন্ত না পেয়ে গতকালের রিকসা চালোনা তিনশ টাকা লুঙ্গির প্যাচ খুলে বের করে দিয়ে বলে স্যার আপনে আমার ম্যায়েডারে বাঁচান। টুটুলের জন্য আমার ম্যায়েডা লজ্জ্বায় অপমানে ঘরে বইস্যা আছে। কলেজে-টলেজে যাতি পাততেছেনা। এসআই তিনশ টাকা হাতে নিয়ে বলে তিনশ টাকায় কি হয়। টুটুলরে ধইরা আনলে আবার নেতারা ফোন করে আমার লোক ছেড়েদেন। নেতাদের সবসময় টুটলমার্কা লোক লাগে। আপনে এখন যান, আমি দেখছি কি করা যায়। এসআই রহমতের কাছ থেকে তিনশ টাকা নিয়েছে তাই দুপুর বেলা দুইজন পুলিশকে সদস্যকে সাথে করে গিয়ে বস্তির অলি-গলিতে টুটুলকে খুঁজে আসে। বস্তির লোকের কাছে বলে আসে টুটুলের এত বড় সাহস, রহমতের মেয়েকে ডিস্টাব করে। মেয়েটা কলেজে যেতে পারছে না। আমি ওকে ধরে থানায় নিয়ে শাস্তি দেবই। রহমত মামলা করেছে ওর নামে।
রহমত টুটুলের নামে থানায় মামলা করেছে, এত্তো বড় সাহস। টুটুলের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। মাগিডা বড়লোকের ছেলের সাথে ফস্টি-নস্টি করে এইটুক বয়সে কইছি তাতে দোষ হেয়া গেছে। মাগিডারে আগে শ্যাষ করবো। টুটুল ববির উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ববির চেহারাকে চিরদিনের জন্য শেষ করে ওর দেমাক দেখতে চাই। রহমত আজ সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এসেছে। মেয়েকে কাছে ডেকে বলে, দুপোরে পুলিশ আইছিলো টুটুলকে পায়নি, আমি থানায় বলে এসেছি। আর সমস্যা নেই মা। যাও তুমি পড়োগে।
রাতে ববি এই সব ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পরে। রেল লাইনের পাশে বস্তির টিনের ঘর। চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি। রাত দুইটার সময় টুটুল এসে কৌশলে চাকু দিয়ে জানালা খুলে ববির মুখে এসিড ছুড়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। এসিডের এই নিমর্ম স্পশে চিৎকার করে ওঠে ববি। চিৎকার শুনে রহমত ও তার স্ত্রী ঘরে এসে দেখে মেয়ের কান্না। তারা দুজনে ভেবে পায়না কি করবে বা কি হয়েছে। মেয়ের মুখে ও শরীলে এসব কি! চিৎকার চেচামেচি শুনে আশে পাশে লোক এসে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এবার রহমত বোঝে টুটুল তার মেয়েকে এসিড মেরেছে। স্বামী-স্ত্রী মিলে শুধুই হাউ-মাউ করে কাঁদে আর বলে আমার ম্যায়ার সোনারমত মুখটা শ্যাষ কইরা দিলো টুটুল।
অপূর্ব সকালবেলা ডাইনিং টেবিলে বসে নাস্তা করতে করতে টেলিভিশনে ববি নাম শুনে তাকাতেই দেখল হাসপাতালের বেডে তার ভালোবাসার মানুষ ববির চেহারা। খবরের শিরোনাম কলেজ ছাত্রীর মূখ ঝলসে গেছে এসিডে। আচমকিয়ে টেলিভিশনের সামনে দৌড়ে এসে ভালো করে শুনলো ববিকে এসিড মেরেছে। অপূর্বও আর স্থির থাকতে পারলোনা। সে বুঝতে পারলো এই কাজ হিরো খোর টুটুলই করেছ । জলদি হাসপাতালে এসে অবাক দৃষ্টিতে শুধু সাধারণ মানুষের মত কিছুসময় ববিকে তাকিয়ে দেখে বের হয়ে আসলো। চোখে মুখে অন্ধকার দেখতে লাগল। পৃথিবীর এই নিকৃষ্ট সমাজ ও মানুষের প্রতি ঘৃনা হতে লাগল। ভালোবাসার মানুষের এই পরিণতি দেখার আগেই কেন তার মৃত্যু হলো না। ববির কষ্টে অপূর্বর হৃদয়ের ভিতর হুহু করে কেঁদে উঠে। হাসপাতাল থেকে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে লাগল, সে কি করে ববির সামনে গিয়ে দাড়াবে। আমার জন্যই ববির আজ এই অবস্থা। ববিকে সে কি করে গ্রহণ করবে! মানুষের কাছে, বাবা-মায়ের কাছে এই এসিড আক্রান্ত ববিকে ভালেবাসার কথা সে কি করে বলবে! কিন্তু ববিকে জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে সে। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এসব ভাবতে ভাবতে মাথা ঘুরতে লাগলো। চোখে মুখে অন্ধকার। অপূর্বর নিজের প্রতি ঘৃণা হতে লাগলো। হঠাৎ পেছনে চোখ ফেরাতেই ট্রাকের হেলপারের কথা কানে আসলো অপূর্বর- ভাই এত হর্ণ দিচ্ছি, আপনি সরলেন না।

0 Comments