ভাব-ভাষা ও নিজস্ব প্রকাশভঙ্গীর গল্পগ্রন্থ 'সংসার থেকে লুকিয়ে’ ~আনিফ রুবেদ

A storybook of language and self-expression 'Sansar te Hile' ~Anif Rubed



রিপন আহসান ঋতুর গল্পগ্রন্থ ‘সংসার থেকে লুকিয়ে’ পড়লাম। যা ভেবেছিলাম পড়ার আগে তারচেয়ে অনেকবেশি ভালো লেগেছে। তবে তার গল্পের মান এখানেই থেমে থাকলে চলবে না মোটেও।

চরম চমৎকার মানের গল্প গঠনের তার ভেতরে ক্ষমতা রয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে। 

গল্পের ভেতর দরকার নতুন ভাব, নতুন ভাষা, নিজস্ব প্রকাশভঙ্গী, জীবনকে নিজের মতো করে দেখার দর্শন ক্ষমতা। ঋতুর গল্পে এসব দেখা দিচ্ছে ছোটো ছোটো হীরার কুচির মতো।

‘অপেক্ষারা নত হয় বিষাদে’ প্রথম গল্প। এ গল্পে ‘প্রতিটি  অঙ্কের মধ্যে একটা গল্প থাকে’ অভিনব ধরনের একটা কনসেপ্ট হিসেবেই হাজির হয়েছে। কিন্তু এতো দামি স্বর্ণ খণ্ডের মতো একটি কনসেপ্ট খুব সাধারণভাবে ক্ষয় হয়ে গেছে। তারপরও আনন্দ পেয়েছি। মনে হয়েছে গল্পকার এসব হীরার কুচি জড়ো করতে খনিতে রূপান্তর করতে পারবেন।

‘মল্লিকা হিজড়ার রাজনৈতিক দায়’ দ্বিতীয় গল্প। এক ভালোবাসার কাঙালকে গল্পে গল্পকার সংজ্ঞায়িত করছেন এভাবে, ‘এখন সে কুকুরের মতো খালি বিস্কুট খোঁজে।’ গল্পটি পড়লে কদিন আগে শরিফ শরিফা নিয়ে যে বাহাস বয়ে গেছে তার লজিক্যাল আর বাস্তবমতের একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারবেন। অবশ্য এ গল্পের মোড় জোড় বেধেছে অন্যএক দর্শনের সাথে, অন্য এক দিগন্তের সাথে। 

‘কোনকিছু ভুলে যাওয়া কারো ইচ্ছাধীন নয়’। এ ধ্রুব দর্শনমাখা বাক্যটি ‘একটি মেয়েলি সন্ধ্যা’ গল্পের গা থেকে খুলে নেওয়া। মানুষ যে কতটা পরাধীন অন্যের কাছে এবং নিজের তার পূর্ণ রূপ ফুটে উঠে এসেছে এই একটি কথার ভেতর। 

কিছু অসাধারণ উপমাও লক্ষ করা যায় ঋতুর গল্পে। মুগ্ধ করতে পারে। যেমন, ‘মৃত্যু মিশ্রিত আখ্যান’ গল্পে রয়েছে ‘বাড়িটা মন্ত্রের মতো পুরাতন’। মন্ত্রের মতো বাড়ি এমনও উপমা হতে পারে! অবাক হতে হয়। শুধু এ বাক্যটা ঘিরে যে দারুণ একটা গল্পবাড়ি হতে পারত তা একেবারে হয়ে না উঠলেও হতাশ হতে হবে না। গল্প ঠিকই দাঁড়িয়ে যায় কাহিনির বাঁক নেবার শক্তির ওপর ভিত্তি করে। এ ক্ষমতা আলাদা।

‘অল্প বয়সী দূরত্ব’ গল্পটি দাঁড়িয়ে রয়েছে আলেকজান্ডার দ্যুমার ‘নারী তোমাকে দুনিয়ার সব শ্রেষ্ঠ কিছু পেতে অনুপ্রেরণা জোগাবে, আর সেটা যাতে তুমি যাতে অর্জন করতে না পারো তারও সকল ব্যবস্থা করা যাবে।’ কথাটির উপর ভিত্তি করে। কিন্তু এ গল্প কি দ্যুমার পক্ষে গিয়ে দাঁড়িয়েছে নাকি বিপরীতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে গল্পটিই পড়ে নিতে হবে। মর্মস্পর্শী এক গল্প। ভালো লাগবে সকলেরই বলেই মনে হয়। 

ব্যক্তিগত প্রেম আর যাপনকে সমাজব্যবস্থার সাথে, রাষ্ট্রব্যবস্থার অসংগতির সাথে মিলিয়ে দেবার সহজাত এক শক্তি লেখকের রয়েছে। ‘আট নম্বর গলির তিন নম্বর বাড়ি’, ‘নদী ও নির্মলা’, ‘দহন ও দুঃস্বপ্নের ক্ষেত’। 

‘রমণী’ অন্য স্বাদের, অন্য সাধের, অন্য ছাঁদের এক গল্প। এক ডিভোর্সি নারী পতিত হতে চলা সাবেক স্বামীর পরিবারকে কিভাবে উদ্ধার করে তারই গল্প। অপূর্ব মানবিকতার এক গল্প।

‘ফিরে আসুক আরেকটি রাত’ গল্পের কাহিনিটা ভালোই ছিল। কিন্তু যেনতেনভাবে বা তাড়াহুড়ো করে মিলাতে গিয়ে একটু খাপ ছাড়া হয়ে গেছে। ডিভোর্স লেটারে সই নেবার ব্যাপারটা অতি নাটকীয় না করে শিল্পসম্মত একটা যৌক্তিকতা দান করা যেত।

‘ঢালুপথ’ ও ‘তৃতীয় দীর্ঘশ্বাস’ থ্রিলারগুণ সম্পন্ন গল্প। পড়তে ভালো লাগে। যদিও এসকল ক্ষেত্রে শিল্পতা কিছুটা মার খায়।

ক্ষণিক নিবিড়তার বিষয় নিয়ে ‘ঘুমিয়ে পড়ার আগে’ গল্পটি একটা মিষ্টি আমেজ তৈরি করবে পাঠকের মনে।

রিপন আহসান ঋতুর গল্পগ্রন্থটিতে মোট তেরটি গল্প আছে। ছোটো ছোটো শরীরের গল্পগুলো পড়ে পাঠক আনন্দ পাবেন নির্ঘাত।

গল্পকারের ভাব, ভাষা, বিষয় নির্বাচন দেখেই বুঝতে বাকি নেই, ধীরে ধীরে আরো আরো চমৎকার গল্প পাব ঋতুর কাছে।


Post a Comment

0 Comments