বিম্বিত প্রতিমুখ ।। এমরান হাসান

Anxious face. Emran Hassan


লেখক জীবনের কোন স্মৃতিকথা হতে পারে কিনা আমার জানা নেই।আমার লেখালেখির শুরুর সময়টা একেবারে না হলেও অনেকটা ছোটবেলায়।যখন পাড়ার ছেলেরা বাড়ির সামনের মাঠে মত্ত  থাকতো,আমি তখন ভর দুপুরে বা সন্ধ্যায় একটানা বই পড়তাম।দক্ষিণারঞ্জন মিত্রের রূপকথার গল্প অর্থাৎ  ঠাকুরমার ঝুলি এবং সোহরাব-রুস্তম গল্পকথা অর্থাৎ ফেরদৌসীর শাহনামা'র কিছু অংশ তখন গল্প আকারে পড়েছিলাম। সময়টা ১৯৯৯ সালের শেষের দিকে।তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাড়িয়ে সবে মাত্র নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা শুরু করেছি। কিছুই বুঝিনা লেখালেখির বা সাহিত্যের। কবিতা বলতে কাজী নজরুল ইসলামের অগ্নিবীণা,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সোনার তরী আর আল মাহমুদের সোনালী কাবিন এই তিনটি বই বাসায় ছিল, ওগুলোই মাঝেমধ্যে নেড়েচেড়ে পড়তাম। টুকটুক করে আসলে লেখালেখি শুরুটা ওই সময় থেকেই হয়ে গিয়েছে কিভাবে সেটা এখন খুব বেশি মনে করতে পারি না তবে এটুকু মনে পড়ে বার গরমের ছুটিতে নানাবাড়ির পুকুরে সাঁতার শেখার জন্য নেমেছিলাম। আমার সমবয়সী ভাই-বোনেরা সবাই গোসল শেষ করে উঠে যাওয়ার পরও আমি ছিলাম দীর্ঘ সময় জলে।সেদিন এক প্রকার টেনে হিঁচড়ে আমার মা আমাকে জল থেকে তুলেছিলেন।দুপুর গড়াতে না করাতেই প্রচন্ড জ্বরে আচ্ছন্ন হয়ে থাকে আমি।ও দিনের জ্বরের ঘোরে মাত্রাবৃত্তের একটি ছড়া দিয়ে শুরু করেছিলাম একেবারে পরিকল্পনা করে  আমার লেখা। সেই থেকে শুরু এমন সময় গেছে যে লিখতে না পারলে নিজের ভেতর পর্যায়ের এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করতো যা এখনো করে।


প্রথম কবিতা প্রকাশের গল্পটা আরেকটু অন্যরকম। ২০০১ সালে তখন আমি বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র।টাঙ্গাইলে কতিপয়তরনের একটা সংগঠন ছিল অর্ক পরিবার তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানেক কেন্দ্র করে  দেয়ালিকা প্রকাশ  করতেন।তাদের সাথে একদিন আমার কোথায় কোথায় পরিচয় হয়ে গেল এবং তার আমার কাছে লেখা চেয়ে নিলেন আমার বেশ মনে আছে আমি তাদের আট চরণের একটি কবিতা দিয়েছিলাম।তো যথাসময়ে লেখাটি দেয়ালিকায় প্রকাশ পেল।ঘটনাচক্রে তারা দেয়ালিকা প্রকাশের জন্য বিন্দুবাসিনী সরকার উচ্চ বিদ্যালয়ের দেয়ালটিকে বেছে নিয়েছিলেন সে সময়।আমি প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় এবং স্কুল থেকে ফেরার সময় নিজের লেখাটির দিকে তাকিয়ে থাকতাম,অদ্ভুত এক আনন্দ অনুভূতি কাজ করতো।২০০৩ সালের অক্টোবর মাসের শেষ দিকে টাঙ্গাইল সাধারণ গ্রন্থাগারের এবং ৭০ দশকের কবি মাহমুদ কামালের সাথে আমার পরিচয় হয়।তার হাতেই আমার প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকায় কবিতা ছাপা হয় সাপ্তাহিক পূর্বাকাশে।সেটা নভেম্বর ২০০৩ সালের  চার তারিখ। এরপর বিভিন্ন জায়গায় লেখা পাঠাতে শুরু করি বিভিন্ন ছোট কাগজ সাহস করে দু একটা জাতীয় দৈনিকে।প্রথম জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য পাঠায় প্রকাশ হয় তৎকালীন দৈনিক আজকের কাগজের সাহিত্যপাতা সুবর্ণরেখায়।২০০৬ সালে। এর আগে সত্যিকার  অর্থে বিভিন্ন পত্রিকায় টুকটাক লেখা ছাপা হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে সাহিত্য পাতাতে কবিতা প্রকাশ ২০০৬ সালে শুরু। ওই সময় এই পাতাটি সম্পাদনা করতেন ৯০ দশকের কবি  শামীম রেজা।সুবর্ণরেখায় আমার বেশ কিছু লেখা প্রকাশ হতে থাকে। পরবর্তী পর্যায়ে দৈনিক স্বাস্থ্যকর এবং দেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের ছোট কাগজে ছাপা হতে শুরু করে ধীরে ধীরে।

লেখালেখির মনে হয়েছে লেখার পাশাপাশি ব্যতিক্রমী পাঠভ্যাস তৈরি করা জরুরী যে কারণে আমার পড়াশোনার গতিপ্রকৃতিতে একটু ব্যতিক্রমী পথে মোড় নেয়া শুরু করে সেই কথা না হয় নাই বললাম। পাঠাভ্যাস একজন লেখকের মস্তিষ্কের উর্বর করে এবং তার লেখনিতে বিভিন্ন ধরনের যোগ করতে তীব্রভাবে সহায়তা করে এ বিষয়টি নির্জলা সত্য। নিজের হাত খরচ বাঁচিয়ে সংগ্রহ করতে থাকি বইয়ের পর বই।পড়া শুরু করি বাংলা সাহিত্য এবং বিশ্ব সাহিত্যের ব্যতিক্রমী কিছু বিষয়। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার চোখের সামনে আশ্চর্য এক জানালা খুলে যায় এবং আমি দেখতে শুরু করি আছে সে ভাবনার গল্প।আমি কি লিখতে  চেষ্টা করেছি,কেনই বা সেটি লিখতে পারছি না, পারিপার্শ্বিক,অর্থনৈতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির দারুণ দোলাচালে মন  ভারাক্রান্ত হয়ে উঠতে শুরু করে তখন থেকেই।ধীরে ধীরে নিজের ভেতর আরো ডুব দিতে শুরু করি। এবং নিজেকে আড়াল করে খুঁজতে শুরু করি নিজের অস্তিত্ব।এর প্রভাব আমার লেখাতে চরম মাত্রায় পড়েছে এটা আমি নির্বিকার চিত্তে স্বীকার করি সবসময়। আমি আসলে নিজেকে আড়াল করতে করতেই এক ধরনের সড়ক তৈরি করার চেষ্টায় ব্রত হয়েছি লেখালেখির প্রায় শুরুর দিক থেকেই।যে কারণে হয়তো সহজ প্রেম, সহজ জীবনব্যবস্থা, সহজ স্বাধীনতা কোন কিছুই আমার লেখায় আমি আনতে পারিনি এখন পর্যন্ত,এই ব্যর্থতার দায় একান্তই আমার।অবশ্য নিজেকে এখনো লেখক হিসেবে নিজেই স্বীকার করিনা।লেখক হতে হলে তো অনেক কিছুই স্বীকার করতে হয়,হজম করতে হয়— যার কোন কিছুই আমি করতে পারিনা। 

টানাপোড়েন তো রয়েছেই।লেখার সময়টিতেই শুধু নয় তার বাইরে যাপিত জীবনে সাহিত্য নিয়ে মানুষের সাথে মেশা,আড্ডা দেয়া, কোন কিছুই আমার দ্বারা খুব বেশি কখনো হয়নি।এই বিষয়টি আমি অপ্রাপ্তি বলবো না,বরঞ্চ এই বিষয়টির কারণেই চিন্তার দরজা ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে তার আপন ভাবনায়।বস্তুত এইসব ভাবনা থেকেই লেখার জন্ম হয়। সবাই এই ধরণের বোধ নিজের ভেতর ধারণ করেন কিনা তা আমার জানা নেই,জানার চেষ্টাও করিনি কখনো। আমি সব সময় আমার লেখায় আমার চিন্তায় আমি যে বলার চেষ্টা করি বা বলার চেষ্টা করেছি সেটা অনেক সময় আমার নিজের বিরুদ্ধে অবস্থান করেছে তবু আমি সে জায়গা থেকে পিছপা হইনি। আমি ওর এ পর্যন্ত লেখক জীবনে যে সমস্ত মানুষের সংস্পর্শে গিয়েছি বা যে সব  মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি তাদের লেখার বোধ এবং তাদের একান্ত নীরবতা খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখেছি এবং যেটি পেয়েছি তা হচ্ছে তারা নিজেদেরকে কখনো ভাঙ্গেননি নিজেদেরকে কখনো সেই ভাবে গড়তেও চাননি রাকিবুল মাত্র তাদের এবং সভ্যতার যে যন্ত্রনা এটুকুই প্রকাশ করার জন্য ব্যাকুল ছিলেন সবসময়। তাদের এই ব্যাকুলতা আমার কখনোই ভালো লাগেনি বরংঅনেক ক্ষেত্রেই তাদেরকে অসহায় মনে হয়েছে কারণ যিনি লিখেন, তিনি কখনোই অসহায় নন।তিনি তো তার নিজের মতো করে তার লেখার ভুবনকে সাজাবেন এবং নিজেকে নিজের উজ্জ্বল প্রতিবিম্বরূপে দাঁড় করাবেন। এজন্যই আমি আসলে বিখ্যাত কবি বা বা প্রাবন্ধিককে অনুসরণ করার বেশি প্রয়োজন মনে করি না ব্যক্তিগত জীবনে বা লেখক জীবনে।

প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির এই জীবনে হিসেব নিয়ে বসাটা এক ধরণের কপটতা বলে আমার কাছে সব সময় মনে হয়েছে।এই যে প্রতিদিন বেঁচে থাকি প্রতিদিন মানুষসঙ্গ করি এসবের ভিতরে অর্জিত যে অসীম ভালোবাসা সেটি একমাত্র লেখালেখির কারণেই  খুব ভালো করে সেটি বুঝতে পারি। এই সময় সমাজের সভ্যতার কারিগর হিসেবে  অনেক মানুষ কাজ করেন।অনেক মানুষ আছেন যারা নিজেদের অর্থ বিত্ত বৈভব সবকিছু দিয়েও সমাজের কিছু মাত্র উপকারও লাগতে পারেন না সে দিক থেকে একজন লেখক অন্তত সমাজের মানুষের ভেতরের বিবেককে জাগ্রত করার কাজটি তো করে,এটুকুই অনেক। এই সমস্ত ভাবনা থেকে আসলে বুঝে দেখতে গেলে প্রাপ্তি অনেক বেশি। কেবলমাত্র আমার ক্ষেত্রে নয় তৃণমূল পর্যায়ে থেকেও যারা কাজ করছেন তারা দেশ-শিল্প-জগত রাষ্ট্র পৃথিবীর সর্বোপরি সবকিছুর কল্যাণের জন্যই কাজ করে যাচ্ছেন।কেবলমাত্র পদক, কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় সম্মাননাই একজন লেখকের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বোচ্চ প্রাপ্তি হতে পারে না।একজন লেখক এর সর্বোচ্চ কৃতিত্ব তো সেই জায়গায় যেখানে তিনি শুধুমাত্র তার লেখার মাধ্যমে একটি জাতি এমনকি গোটা মানব সমাজের ভিতকে পর্যন্ত নাড়িয়ে দিতে পারেন। 

একজন লেখক যখন লেখা শুরু করেন সেদিন থেকে নিয়ে তিনি যতদিন বেঁচে থাকেন ততোদিনই তার সাহিত্যজীবন হিসেবে গণ্য করা উচিত।তার সামাজিক, পারিপার্শ্বিক,অর্থনৈতিক সমস্যা থাকতেই পারে কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে তিনি একজন লেখক হয়ে ওঠার চেষ্টাটি করে যান তার সারা জীবনের সাধনার দ্বারা। প্রাপ্তির ঝুলিতে যোগ হয়েছে অনেক অনেক বিখ্যাত মানুষের সাহচর্য, তাদের অনুপ্রেরণা, তাদের উৎসাহ সেই সাথে যুক্ত হয়েছে কাছের কিছু মানুষের দুর্দান্ত উপেক্ষা  আর অবহেলা।তারপরও কবিতা যাপনের দায় থেকেই শিল্পের দরজায় সবসময়ই  কড়া নেড়ে  যাই কী এক অদম্য উচ্ছ্বাসে!

Post a Comment

0 Comments