শাহেদ কায়েস এর আত্মস্মৃতি ।। মায়াদ্বীপ: স্বপ্ন-ছোঁয়ার গল্প

Autobiography of Shahed Kayes. Mayadweep: A Dream-Touching Story



প্রথম দেখাতেই অপার বিস্ময়



জীবন মৃত্যুর এই আলোছায়াময় খেলা

আমাকে ভীষণ কাছে টেনে নেয়;

যখন ভোরের আলো দিবসের শৈশব

অন্ধকার গুটিয়ে নেয় তার নির্জন ডানা

চর-বালাদের ঘোর কাটে।  


আগুনের লাল আঁচড় নির্ঘুম চোখে

এই ছুটন্ত মেঘনা তীরে― 

রুপান্তরের মায়া, অর্ধসত্য জীবন!


দুই দীর্ঘশ্বাসের মাঝ বরাবর হেঁটে যায়

স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্নের মধ্যে সরু পথ দিয়ে

সোনালী মেঘের বাড়ি, জলের সংসার―

আর সুপ্রভাতের শিশুরা জেগে ওঠে দিকে দিকে…


(মায়াদ্বীপের পাঠশালা/ মায়াদ্বীপ)  



প্রথম দেখাতেই অপার বিস্ময়, ভালোলাগা, ভালোলাগা থেকে ভালোবাসা। ভালোবাসা থেকে একটি ‘কবিতার’ জন্ম, একটি কবিতা থেকে একটি ‘স্কুলের’ জন্ম, স্কুল থেকে চরের ‘নামকরণ’, ভূমিহীন মৎস্যজীবীদের চর রক্ষা করতে ‘মায়াদ্বীপ-রক্ষা আন্দোলন’, আন্দোলনের ফসল হিসেবে জাতীয় সংসদে একটি নতুন ‘আইনের’ জন্ম, সেই আন্দোলন থেকে একটি ‘কবিতা বইয়ের’ জন্ম। সংক্ষেপে স্বপ্ন-ছোঁয়ার গল্পটা অনেকটা এমনই।   


২০০৬ সালের অক্টোবর মাস। বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিলাম চারদিকে মেঘনা নদী বেষ্টিত সোনারগাঁয়ের ছোট্ট এক চরে। তখনো তার নাম অজানা। তখন শরৎকাল, নীল আকাশের নিচে অজস্র কাশবনের আনন্দ-উচ্ছ্বাস… বইছে সু-শীতল বাতাস! মনোমুগ্ধকর ওই দৃশ্য দেখে সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে এসে ওই চর নিয়ে আমি ‘মায়াদ্বীপের পাঠশালা’ নামে একটি কবিতা লিখেছিলাম। পরবর্তীতে ওই কবিতাটি ২০১৫ সালে ঐতিহ্য প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত আমার তৃতীয় কবিতার বই “মায়াদ্বীপ”-এ অন্তর্ভুক্ত হয়। সেই শুরু থেকেই, ২০০৬ সালের অক্টোবর থেকে আমি ভালোবেসে এই চরকে নাম দিই ‘মায়াদ্বীপ’। আমার সঙ্গে সঙ্গে আমার বন্ধুরাও এই চরকে ‘মায়াদ্বীপ’ নামে ডাকতে শুরু করে। 


চারদিকে নদী ঘেরা চর ‘নুনেরটেক’ ঘেষে মেঘনা নদীতে জেগে ওঠে নতুন একটি চর। নতুন জাগা ওই চরের তিনটি অংশ— সবুজবাগ, গুচ্ছগ্রাম ও রঘুনারচর। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ সরকার ‘গুচ্ছগ্রাম’ প্রকল্প করেছিল এখানে। যদিও পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে নতুন সরকার এসে ওই প্রকল্প বাতিল ঘোষণা করে দিয়েছিল, তবুও গুচ্ছগ্রামের ওই পরিবারগুলো সেখানেই থেকে যায় এবং তাঁরা এখনো সেখানেই বাস করছেন।



মায়াদ্বীপ শিশু পাঠশালা


নতুন জাগা সেই চরে কোনো স্কুল ছিল না, বিদ্যুৎ ছিল না, নাগরিক কোনো সুযোগ-সুবিধাই ছিল না। অধিকাংশ মানুষ ছিল সুবিধাবঞ্চিত, অবহেলিত। বয়স্কদের মধ্যে শিক্ষার হার ছিল পাঁচ ভাগেরও নিচে। যেদিন প্রথম গিয়েছিলাম, সেদিনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ওই চরে শিশুদের জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করব। পরের বছর ২০০৭ সালে ‘মায়াদ্বীপ শিশু পাঠশালা’ নামের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলাম সেই চরে। আমি নিজে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত, সেই সুবাদে অনেক কবি-লেখক-সাংবাদিক বন্ধুরা সোনারগাঁ বেড়াতে আসেন। ২০০৯ সালের জুলাই মাসে কবি, নাট্যকার ও গবেষক সাইমন জাকারিয়া এই চরে আসেন বেড়াতে এবং আমাদের ‘সুবর্ণগ্রাম’-এর কার্যক্রম দেখে এই নিয়ে পত্রিকায় লেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে ২০০৯ সালের ৮ আগস্ট প্রথম আলো পত্রিকার সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘ছুটির দিনে’ ‘মায়াদ্বীপের পাঠশালা’ নামে কাভার স্টোরি ছাপা হয়। কবি-নাট্যকার সাইমন জাকারিয়া এই কভার স্টোরিটি লিখেছিলেন।




এরপর ‘এটিএন বাংলা’ টেলিভিশনে কবি-গল্পকার ও সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নি একটি প্রতিবেদন করেছিলেন সুবর্ণগ্রামের কার্যক্রম নিয়ে। এছাড়া আমাদের ‘সুবর্ণগ্রাম’-এর শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে ‘বাংলা ভিশনে’ ‘দিন বদলের মানুষ’ নামে প্রায় ৪৫ মিনিটের একটি প্রতিবেদন করেছিলেন কবি ও বাচিক শিল্পী রবি শঙ্কর মৈত্রী। এরপর ২০১১ সালে একাত্তর টেলিভিশনে প্রচারিত হয় “পরিবর্তনের মানুষ”। তখন থেকে দেশ-বিদেশে নতুন জাগা ওই  চরের নাম ‘মায়াদ্বীপ’ বলে প্রচার হতে থাকে। 


এরপর থেকে অবহেলিত এ অঞ্চলে পর্যটকদের পদচারণা শুরু হয়। দলবেধে ট্রলার ও লঞ্চে পর্যটকরা ছুটে আসেন এই মায়াদ্বীপে। মেঘনা নদী বেষ্টিত এ দ্বীপের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে। অনেক জ্ঞানী-গুণী মানুষ, দেশ-বিদেশের লেখক-কবি-শিল্পীরা মায়াদ্বীপের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে এখানে বেড়াতে আসেন। এরমধ্যে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা লেখক ও অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ, তথ্য প্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বার, পরিবেশবিদ আবু নাসের খান, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী— ঢাকা, ইউল্যাব, নর্থ সাউথ, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনালসহ আরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মায়াদ্বীপে ছুটে আসেন বেড়াতে, এবং সুবর্ণগ্রাম-এর সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে। 



মায়াদ্বীপ রক্ষা আন্দোলন


২০১০ সালের জুন মাসে যখন মায়াদ্বীপের খুব নিকটে চর ঘেষে মেঘনা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন শুরু হয়, তখন মায়াদ্বীপের মানুষ ও দ্বীপের অপার সোন্দর্য্যকে রক্ষা করতে, এখানে বসবাসকারী মানুষদের জীবন-জীবিকা, ও পরিবেশ রক্ষার জন্য মায়াদ্বীপ-এর মানুষদের সঙ্ঘবদ্ধ করে আমি আন্দোলন শুরু করি। এই আন্দোলনের নামকরণ করি ‘মায়াদ্বীপ রক্ষা আন্দোলন’। এই আন্দোলনের সঙ্গে তখন সংহতি প্রকাশ করেন স্থানীয় জনগণ ছাড়াও সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার লেখক-কবি ও শুভবুদ্ধি সম্পন্ন অনেক মানুষজন। এই আন্দোলনের সঙ্গে আমরা যুক্ত করি বিভিন্ন পেশাজীবির লোকজন ও পরিবেশবাদী সংগঠনকে। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও এ আন্দোলনের কথা ছড়িয়ে পড়ে। 


মাঠের আন্দোলনের পাশাপাশি আমরা অনেক কার্যক্রম হাতে নিয়েছিলাম, এর মধ্যে কিছু ছিল এমন— প্রশাসনের বিভিন্ন লেভেলে এই ব্যাপারে জানানো, সোনারগাঁ উপজেলার ইউএনও, এসি-ল্যান্ড, নারায়ণগঞ্জ জেলার ডিসি বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া, বালু সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রেসক্লাবে এবং জেলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠনকে বিষয়টা সম্পর্কে জানানো। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা), বেলা; হংকং বেইজড মানবাধিকার সংগঠন ‘এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন’, জাতিসংঘসহ অনেক দেশি-বিদেশী প্রতিষ্ঠানে আমরা মাসের পর মাস ইমেইল করেছি। এর ফলশ্রুতিতে ২০১২ সালে জাতিসঙ্ঘ এই চর নিয়ে ইন্টারভেইন করে। বাংলাদেশ সরকারকে ৮ পৃষ্ঠার একটি চিঠি লিখে। সেই চিঠিতেও চরের নাম ‘মায়াদ্বীপ’ উল্লেখ করা ছিল। এমনকি এই চর রক্ষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ২০১০ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সোনারগাঁ উপজেলা প্রশাসনের কাছে যত চিঠি এসেছিল তাতে ‘মায়াদ্বীপ’ নামটি উল্লেখ করা হয়েছিল। এখানে উল্লেখ্য যে, বাস্তবে সরকারি নথিতে ‘মায়াদ্বীপ’ শব্দটির কোনো অস্তিত্ব তখনো ছিল না, এখনো নেই। যদিও এই নামটি সরকারিভাবে রেকর্ডভুক্ত না, তবুও মায়াদ্বীপ আছে মানুষের হৃদয়ে, মানুষের মুখে মুখে। ভবিষ্যতে একদিন এই চরের নাম সরকারিভাবেও মায়াদ্বীপ হবে বলে আমরা আশা করছি। 


এছাড়াও সরকারি অনেক কর্মকর্তা এসেছেন এই মায়াদ্বীপে বেড়াতে এবং মায়াদ্বীপের মানুষের সমস্যার কথা শুনতে। ২০১০ সালের ১৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক সাজ্জাদুল হাসান, সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সোলতান আহমেদ এবং মো. আব্দুল্লাহ হাসান চৌধুরী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. আবুল কালাম, কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন, নারায়ণগঞ্জ-এর জেলা প্রশাসক মো. সামছুর রহমান এসেছিলেন। ২০১০ সালের ১৯ অক্টোবর বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এ এন এম সফিকুল ইসলাম, বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপসচিব এ কে এম দিদারুল ইসলাম, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সহকারি সচিব সুলেখা বসু, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারি সচিব নাজমুন নাহার মান্নু এসেছিলেন মায়াদ্বীপে। 


এই ‘মায়াদ্বীপ রক্ষা আন্দোলন’ নিয়ে আমি এবং আমার লেখক বন্ধুরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, বিশেষ করে ফেসবুকে, জাতীয় পত্র-পত্রিকায় অনেক লিখেছিলাম। আমার বন্ধুরা ফেসবুকে ‘মায়াদ্বীপ বাঁচান’ নামে একটি গ্রুপও তৈরি করেছিল, যেখানে ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৪ বছর এই আন্দোলন নিয়ে নিয়মিত আপডেট দেওয়া হতো। ২০১০ সালের ২২ ডিসেম্বর দৈনিক প্রথম আলোতে “আমি মায়াদ্বীপ, আমাকে বাঁচাও” এই শিরোনামে আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। আমাদের মায়াদ্বীপ রক্ষা আন্দোলন এবং এই চরকে  আরও ভালোভাবে বোঝার স্বার্থে লেখাটি নিচে তুলে ধরছি।  



শাহেদ কায়েস এর আত্মস্মৃতি ।। মায়াদ্বীপ: স্বপ্ন-ছোঁয়ার গল্প



“আমি মায়াদ্বীপ, আমাকে বাঁচাও”


শাহেদ কায়েস


প্রকৃতির খেয়ালে পৃথিবীতে যেমন অনেক কিছু ঘটে, তেমনি প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ব্যাঘাত সৃষ্টি করলে প্রকৃতি বড় অসহায় বোধ করে। আমি প্রকৃতির সহোদরা। আমার নাম মায়াদ্বীপ।


ঈশা খাঁ এই বাংলা নামের বদ্বীপের যেখানটায় তাঁর দেশের রাজধানী গড়েছিলেন, তার পাশ ঘেঁষে বয়ে গেছে মেঘনা নামের অপূর্ব রূপমোহিনী এক নদী। সে নদীর তীরে তোমাদের ভালোবাসার সোনামোড়া সোনারগাঁ। এই সোনারগাঁ থেকে নদীপথে চার কিলোমিটার দূরে মেঘনা নদীর বুক চিরে এখন থেকে প্রায় শত বছর আগে একটি ভূমি জেগে উঠেছিল, যার নাম তোমরা রেখেছিলে নুনেরটেক। সমুদ্রের পানি লোনা আর মেঘনার পানি মিঠা হলেও কেন যেন নাম রাখা হয় নুনেরটেক। সেই নুনেরটেকের কোলেই আমার জন্ম প্রায় ৩৫ বছর আগে। নদীকে আমরা মা বলে ডাকি। সেই নদীর বুকে জেগে ওঠে যে চর, তার নাম নদীকন্যা। নদীকন্যা নুনেরটেকের সহোদরা বোন আমি মায়াদ্বীপ।


আমার বুকে যে তিনটি অংশ রয়েছে, তার আছে আলাদা তিনটি নাম। গুচ্ছগ্রাম, সবুজবাগ আর রঘুনার চর। আমি নিরবধি মিঠা পানির জাতক বলে আমার বুকে অবারিত ঘুরে বেড়ায় কত হাজার জলজ প্রাণী। আর তীরজুড়ে কত শত মানুষের স্বপ্ন-বেদনার ইতিহাস। ছোট্ট আমার রূপলহরিজুড়ে প্রকৃতির যে অপূর্ব সমারোহ, তার মায়াবি টানে তোমাদেরই ক’জন মানুষ আমার কোলে ছুটে আসে। কিন্তু আমার কোলে আশ্রয় আর মমতায় যারা রয়েছে, তারা বঞ্চিত সভ্যতার সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা আর প্রাপ্য থেকে। এর মধ্যে প্রধান হলো, শিক্ষার আলো।


আমি ও আমার কোলের মানুষগুলোর দুর্দশা দেখে আমাদের জাগিয়ে তুলতে, স্বপ্নবান করে তুলতে আমার নাম দেওয়া হয় মায়াদ্বীপ। নতুন এই মায়াদ্বীপের মায়ায় পড়ে ধীরে ধীরে এখানে আসতে শুরু করে দেশ-বিদেশের কত কত কল্যাণকামী মানুষ। সেই থেকে বঞ্চনায় ডুবে থাকা আমার কোলের মানুষগুলোর বুকজুড়ে ডানা মেলে বেঁচে থাকার নতুন প্রত্যয়। একদা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত এই মানুষগুলো যাকে নিয়তি বলে মেনে নিত, তাদের চোখেও খেলতে থাকে নতুন নতুন স্বপ্ন।



অন্ধকারে চোখ মেলে আলোর ভুবন


পৃথিবীজুড়েই শিশুরা সর্বাধিক বঞ্চনার শিকার। আর আমার কোলে জলে ও কাদায় দিনভর কলকাকলিতে মেতে থাকে যে শিশুরা, তারা তারও অধিক সুবিধাবঞ্চিত। এই শিশুদের বেড়ে ওঠা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, ভবিষ্যতের স্বপ্ন—একসময় এসবের কিছুই ছিল না। কিন্তু আমার নাম যখন দেওয়া হয় মায়াদ্বীপ, এর সঙ্গে শুরু হয় যেন হাজার হাজার মায়াস্বপ্নের জালবুনন। যাবতীয় সুবিধাবঞ্চিত এখানকার নিরক্ষর শিশুগুলোর প্রাণে আলোর শিখা জ্বালাতে সামাজিক প্রতিষ্ঠান সুবর্ণগ্রামের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে মায়াদ্বীপ জেলে শিশু পাঠশালা। এর মাধ্যমে এখানকার শিশুদের এখন দেওয়া হয় শিক্ষার আলো।





সঙ্গে সঙ্গে আমার কোলে বেড়ে ওঠা নিয়তিনির্ভর মানুষগুলোর প্রাণে সুবর্ণগ্রামের পক্ষ থেকে গড়ে তোলা হচ্ছে সব ধরনের জনসচেতনতা। ফলে এই নিয়তিনির্ভর মানুষগুলো এখন তাদের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করে নিচ্ছে সঠিক বাস্তবতার বোধও। এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন দেশের কয়েকজন খ্যাতিমান তথ্যপ্রযুক্তিবিদ এবং প্রকৃতি ও মানবদরদি ব্যক্তি। এখন আমার কোলে জলে ও কাদায় বেড়ে ওঠা শিশুগুলো পাঠ নিচ্ছে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের।


বালুখেকোদের দৌরাত্ম্য


খরস্রোতা মেঘনা থেকে তিলে তিলে পলি-বালু সংগ্রহ করে আজ আমি মায়াদ্বীপ। আমাকে ভালোবেসে আমার বুকে দেড় হাজার মানুষের বসবাস, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা। কিন্তু কিছু বালুখেকো আমার বুকে আঁচড় বসিয়েছে। কয়েক মাস ধরে আমার বুকের পাশ থেকে ড্রেজার দিয়ে রাত-দিন তুলে নেওয়া হচ্ছে বালু। এর ফলে ভাঙতে শুরু করেছে আমার চারপাশ। ফলে এখানে বসবাস করা মানুষগুলো পড়েছে চরম অস্তিত্বহীনতায়। এভাবে আর কিছুদিন যদি বালুখেকোরা বালু উত্তোলন অব্যাহত রাখে, তাহলে আমার অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাবে। আমাকে রক্ষা করতে আমার বুকে বসবাস করা মানুষগুলো জেলা প্রশাসনের আহ্বানে সম্মিলিতভাবে গত ১০ ডিসেম্বর প্রতিরোধ গড়ে তোলে বালুখেকোদের বিরুদ্ধে।


কিন্তু তারা অনেক ক্ষমতাবান, এত ক্ষমতাবান যে দেশের মানুষ তাদের নাম জানে, অনেকে ভয়ও পায়। তাদের ইচ্ছায় বাধা দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে বালুখেকোরা আমার বুকে বসবাস করা সব মানুষের বিরুদ্ধে ঠুকে দেয় ষড়যন্ত্রের মামলা। এর পর থেকেই আমার দেড় হাজার সন্তান নিরাপত্তাহীনতা আর গ্রেপ্তার-আতঙ্কে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছে। তাদের স্বাভাবিক জীবনের পদে পদে নেমে এসেছে ভয়, শঙ্কা আর অনিশ্চয়তা। এই দেড় হাজার মানুষকে শুধু উচ্ছেদই নয়, পুরো মায়াদ্বীপকেই তারা বিলীন করে দিতে চায়। তাদের বালু দরকার, মানুষ দরকার নেই। কিন্তু এই দ্বীপে মানুষ না থাকলে তো আমি মায়াদ্বীপও থাকব না।


শাহেদ কায়েস এর আত্মস্মৃতি ।। মায়াদ্বীপ: স্বপ্ন-ছোঁয়ার গল্প



এই পরিস্থিতি থেকে আমার দেড় হাজার সন্তান ও তাদের স্বপ্নকে বাঁচাতে আর তাদের জীবনধারণ ও বসবাস নিশ্চিত করতে আমি সোনারগাঁবাসীসহ দেশবাসীর কাছে আকুল আবেদন করছি। আমি তোমাদের মায়াদ্বীপ, আমাকে বাঁচাও। আমার অস্তিত্ব রক্ষায় আমার পাশে দাঁড়ান: ফেসবুক গ্রুপ— মায়াদ্বীপ বাঁচান।"


নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সামছুর রহমান শুরুর দিকে আমাদের ‘মায়াদ্বীপ রক্ষা আন্দোলন’-এর পক্ষে থাকলেও, পরবর্তীতে তিনি রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের চাপে আর থাকতে পারেন নি। সেই সময় যারা আন্দোলনের পক্ষে ছিল আমি সহ চরবাসীর অনেকের বিরুদ্ধে বালু সন্ত্রাসীরা একের পর এক উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে মিথ্যা মামলা করেছিল। তখন আমি বাধ্য হয়ে ২০১১ সালে হাইকোর্টে মায়াদ্বীপ রক্ষায় জনস্বার্থে রিট করেছিলাম। ওই রিট পিটিশনের শুনানি শেষে ২৬/৪/২০১১ সালে বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ এবং বিচারপতি মো. শাখাওয়াত হোসাইন রুল জারি করেছিলেন এবং চরবাসীর পক্ষে সংশ্লিষ্ট বালু মহালে 'স্টে অর্ডার’  দিয়েছিল। (Writ Petition No. 3325 of 2011) 


এতকিছুর পরও বালুকাটা (আসলে চরকাটা) পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কিছুদিন বন্ধ থাকতো, আবার শুরু হতো। যদিও এইসব বালু উত্তোলন কোম্পানি নারায়ণগঞ্জ জেলা ডিসি অফিস এবং কুমিল্লা জেলা ডিসি অফিস  থেকে ইজারা নিয়ে থাকে, কিন্তু নদীর যে স্থানে ‘বালু মহাল’ ইজারা নেয়, সেখানে না কেটে তারা অধিক মুনাফার লোভে বালু কাটে চরঘেঁষে। যার ফলে চরবাসী তাঁদের বসতবাড়ি, জীবন-জীবিকা হারিয়ে সর্বহারায় পরিণত হয়।


উপরে উল্লেখ করেছি, মায়াদ্বীপ রক্ষা আন্দোলনের অংশ হিসেবে আমরা জাতিসংঘেও অনেক ইমেইল করেছিলাম। ২০১২ সালের ২২ মার্চ জাতিসংঘ এই চর নিয়ে ইন্টারভেইন করেছিল। সেখানে ইউনাইটেড নেশন্স-এর Raquel Rolnik (Special Rapporteur on adequate housing as a component of the right to an adequate standard of living, and on the right to non-discrimination in this context) বাংলাদেশ সরকারকে এই চর নিয়ে যে চিঠি পাঠিয়েছিল তার রেফারেন্স হল: (REFERENCE: AL Housing (2000-9) Poverty (1998-11) Food (2000-9) BGD 2/2012) 


জাতিসংঘের এই চিঠি আসার পর বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেয়, এবং ২০১২ সালেই জাতীয় সংসদে নতুন একটি আইন পাশ করেছিল, যার নাম “জাতীয় বালুনীতি আইন ২০১২” (National Sand-mining Law 2012)। 





সেই সময় আমাদের বিরুদ্ধে ৮টি মামলা করেছিল অবৈধ বালু সন্ত্রাসীরা। এর মধ্যে দুইটি মামলার ১ নম্বর আসামী ছিলাম আমি। মায়াদ্বীপবাসীদের অনেকেই হামলা, মিথ্যা মামলা ও আক্রমণের শিকার হয়েছেন, তাঁদের জীবিকা, অর্থাৎ  নদীতে মাছধরা বন্ধ করে দিয়েছিল অনেকবার। আমি নিজে তিনবার আক্রমণের শিকার হয়েছি। ২০১৩ সালের ২৫ জুলাই বালু সন্ত্রাসীরা আমাকে কিডন্যাপ করে নিয়ে গিয়েছিল মেঘনা নদীর মাঝখান থেকে, উদ্দেশ্য ছিল মেরে ফেলার। পরে সাংবাদিক বন্ধুদের তৎপরতায় ও প্রশাসনের সহযোগিতায় আমাকে উদ্ধার করা হয়েছিল। পরিস্থিতি যখন খুব নাজুক ছিল, তখন কিছু সময়ের জন্য আমি দেশছাড়া থাকতেও বাধ্য হয়েছিলাম।




মায়াদ্বীপের ভৌগলিক অবস্থান 


মায়াদ্বীপ নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার মেঘনা নদী বেষ্টিত ছোট্ট একটি চর। এই চরে বর্তমানে প্রায় দুই হাজার মানুষের বসতি। এর পাশের চরের নাম নুনেরটেক, যেটা প্রায় ২০০ বছর প্রাচীন একটি চর। সেই চরের জনসংখ্যা প্রায় পনেরো হাজার। নুনেরটেকে রয়েছে স্বনামধন্য একজন ইসলামিক স্কলার নুরুল ইসলাম লালপুরীর সমাধী (লালপুরি শাহ্‌ দরবার শরীফ)। মায়াদ্বীপের উত্তর দিকে নুনেরটেক, দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মেঘনা নদীর বড় অংশ, নদীর ওইপাশে কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানার রাম প্রসাদের চর।    








মানুষের জীবন-জীবিকা 


মায়াদ্বীপের মানুষের মূল পেশা হচ্ছে মাছ ধরা। এর পাশাপাশি তাঁরা খণ্ডকালীন কৃষিকাজ করে থাকেন, কেউ কেউ সোনারগাঁ এবং নারায়ণগঞ্জে গার্মেন্টস-এ পোশাক শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। খুব অল্প সংখ্যক আছেন মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী শ্রমিক। শীতকালীন কয়েকমাস যখন নদীতে তেমন মাছ পাওয়া যায় না, তখন তাঁদের অনেকেই বেরিয়ে পড়েন সোনারগাঁয়ের নানান গ্রামে, বাড়ি বাড়ি কাপ-পিরিচ বিক্রি করেন, কেউবা ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে মাছ এনে সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাছ বিক্রি করেন। 



শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা


মায়াদ্বীপে আমাদের গড়া একটি পাঠশালা আছে। এর নাম “মায়াদ্বীপ শিশু পাঠশালা”। মায়াদ্বীপ রক্ষা আন্দোলন করতে গিয়ে আমাদের এই স্কুলটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বালু-সন্ত্রাসীদের রোষের শিকার হয়েছে। আমরা সেই স্কুল ঘরটি পুনরায় নির্মাণের জন্য চেষ্টা করছি। পাশের চর নুনেরটেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে, এবং একটি উচ্চ বিদ্যালয় আছে। ‘মায়াদ্বীপ শিশু পাঠশালা’ থেকে পাশ করা অনেক ছাত্র-ছাত্রী এখন ‘নুনেরটেক হাই স্কুলে’ পড়ে। দুঃখজনক হলেও সত্য মায়াদ্বীপে কোনো স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা নাই। এই চরে কেউ অসুস্থ হলে তাঁকে প্রায় ১ ঘণ্টা সময় নদী পাড়ি দিয়ে মেইনল্যান্ড সোনারগাঁ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যেতে হয়। সন্ধ্যার পরে সেই ব্যবস্থাও থাকে না। 








মায়াদ্বীপ-এর বর্তমান পরিস্থিতি  



যদিও অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে মায়াদ্বীপের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, তারপরও চরটি পুরোপুরি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়নি। ‘মায়াদ্বীপ রক্ষা আন্দোলন’-এর ফলে এবং সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে এখনো চরটি টিকে আছে এবং ওই চরে মানুষের বসতি আছে। মায়াদ্বীপে এখন বিদ্যুৎ এসেছে (পল্লী বিদ্যুৎ)। মুজিববর্ষ উপলক্ষে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এই ব্যবস্থা করেছে। মায়াদ্বীপই বাংলাদেশে প্রথম, যেখানে নদীর তলদেশে পাইপ দিয়ে একটি জনপদে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। 


বর্তমানে মায়াদ্বীপ সোনারগাঁয়ের অন্যতম একটি ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। শুক্র-শনি বার এবং সরকারি ছুটির দিনে সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা থেকে অনেক ভ্রমণ পিপাসু মানুষ এখানে বেড়াতে আসেন। সোনারগাঁয়ের বৈদ্যেরবাজার ঘাট থেকে ট্রলারে (ইঞ্জিন চালিত নৌকায়) চড়ে মায়াদ্বীপ যেতে ৪০ মিনিট সময় লাগে। অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের একটি স্থান মায়াদ্বীপ। এখানে শীতে সেন্ট মার্টিন-এর আমেজ পাওয়া যায়। মায়াদ্বীপ ঘুরে বেড়ানোর জন্য চমৎকার একটি স্থান। 

________

Post a Comment

0 Comments