আশরাফ খান এর মুক্তগদ্য

 

আশরাফ খান এর প্রবন্ধ

 

অনেক দিন আগের কথা।

তখন এদেশের মানুষগুলো কেবল মুঠোফোনের ব্যবহার শিখতে শুরু করছে।

 

ভাঙ্গা টিনের চালের ফাঁক দিয়ে সূর্যরশ্মি তির্যকভাবে চোখের উপর পড়লে ঘুম ভেঙে যায়। টের পেলাম সকাল হয়েছে। ঘুম ঘুম চোখে তাকালাম দেয়াল ঘড়ির দিকে। ঘড়ির কাটা টিক টিক শব্দে বিরতিহীন ঘুরছে। যেন পৃথিবী ঘুরছে। ঘড়ির সবচেয়ে ছোট কাটা নয় ও দশের মাঝামাঝি অবস্থান করছে। হাতে কোন জরুরী কাজ নেই। বিছানা ছেড়ে আয়েশী শরীরে টুথব্রাশটি হাতে নিয়ে দেখি ব্রাশের তুলিগুলো ছড়িয়ে শাপলা ফুলের মতো আকার ধারণ করেছে। টুথপেস্টের টিউবে দুই হাতের দশ আঙুল চেপে শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেও একটু পেস্ট বের করতে ব্যর্থ হয়ে পুরানো অভিজ্ঞতা কাজে লাগালাম। ব্লেড দিয়ে টিউবটি কেটে এর কোণে লুকিয়ে থাকা পেস্টটুকু ব্রাশে লাগিয়ে দাঁত ব্রাশের কাজ সারলাম। মনে মনে ভাবলাম আজ না হয় হলো। কিন্তু কাল কী হবে? গোসলের সাবান ফুরিয়ে গেছে সাতদিন হলো। চুলে জট ধরেছে প্রায়। মাথায় শ্যাম্পু করা দরকার। বালিশের নিচে চকচকে দুই টাকার একটি নোট রেখে দিয়েছি বেশ কয়েকদিন হলো বিশেষ কোন কাজে লাগাবো বলে। নিরুপায় হয়ে সেই নোটটি পকেটে নিয়ে একটি সানসিল্ক মিনি প্যাক আনার জন্য দোকানের দিকে ছুটলাম। দোকানে গিয়ে ঝুলানো ওয়াশিং পাউডার দেখে মনে পড়লো কাপড়গুলো নোংরা হয়ে আছে। তখন শ্যাম্পুর চেয়ে ওয়াশিং পাউডারের প্রয়োজন বেশি বলে প্রতীয়মান হয়। তাই শ্যাম্পুর বদলে ওয়াশিং পাউডার নিয়ে আসলাম।

 

তোয়ালে দিয়ে লুঙ্গির কাজ চালাচ্ছি অনেকদিন ধরে। বালিশের কভারটা ছিড়ে গেছে। এক বন্ধুর কাছ থেকে উপহার পাওয়া একটি বড়সড় রুমাল বিছিয়ে দিয়েছি বালিশের উপর। আয়নার ফ্রেমটা ভেঙে গেছে। চিরুনির খিলগুলো অর্ধেক নির্বাসনে। মাথার উস্কখুস্ক চুলগুলো ভেড়ার গায়ের লোমের মতো আকার ধারণ করেছে। ভাঙা দুটো চোঁয়ালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি বেড়েই চলছে। হাত ঘড়িটার পিন ভেঙে গেছে। বিধায় ঘড়িটা পকেটে রেখে সময় দেখার কাজ চালাচ্ছি। চশমার কাঁচও ভেঙ্গে গেছে। মেরামত করবো করবো করে বছর দুই চলে গেলো। আগামী দুই বছরেও মেরামত করা হবে বলে মনে হয় না। স্বাস্থ্য বলতে শুধু কয়েক জোড়া হাড়। রাতে ছেড়া মশারির ফুটো দিয়ে অনুপ্রবেশকারী মশাদের নিপীড়নে তারও বেহাল অবস্থা। লেখার উপকরণ কাগজ কলমেরও চরম সংকট চলছে। কাগজ থাকলে কলম থাকে না আবার কলম থাকলে কাগজ থাকে না। আবার যখন কাগজ কলম থাকে তথন লেখার মানসিকতা থাকে না।

 

আগামী সপ্তাহে অধরার জন্মদিন। নিমন্ত্রণ পেয়েছি। যেতে ভীষণ ইচ্ছে করছে। কিন্তু যাওয়া হবে না। খালি হাতে যেতে কোনো বাধা নেই। বরং উপহার নিলে গেলেই তার আপত্তি। তবুও সামাজিক রীতি বলে একটা বিষয় আছে। আমাদের মতো বেকার যুবকদের আত্মমর্যাদা বোধ অন্যদের তুলনায় একটু বেশি হয়ে থাকে। এমনও অনেক বেকার মধ্যবিত্ত মানুষ আছে যাদেরকে বছর শেষে ঈদ অথবা পূজা পার্বণে এক সেট নতুন পোশাক কিনতে হিমশিম খেতে হয়। এসব মানুষগুলোর জীবনে উৎসব আনন্দ নয় বরং যেন অভিশাপ হয়ে আসে। এই যে একটা ভুল বললাম। মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্ত শব্দটি দ্বারা আমরা নিজেদেরকে একটা মিথ্যে আভিজাত্যের মোড়কে আবদ্ধ রাখাার চেষ্টা করি। আমরা যারা নিজেদের মধ্যবিত্ত বলে পরিচয় দিই তাদের অনেকেই মধ্যবিত্ত নয়। এমন কি নি¤œবিত্তও নয়। মূলত বিত্তহীন।

 

অধরা নামটি মনে হলে ররি ঠাকুরের সুরবালার কথা বারবার মনে পড়ে। ‘সুরবালার সঙ্গে একত্রে পাঠশালায় গিয়াছি, বউ বউ খেলিয়াছি। তাহাদের বাড়িতে গেলে সুরবালার মা আমাকে বড়ো যতœ করিতেন এবং আমাদের দুইজনকে একত্র করিয়া আপনা-আপনি বলাবলি করিতেন-আহা, দুটিতে বেশ মানায়।’ ররি ঠাকুরের সুরবালা আর অধরার মধ্যে কোথাও একটা মিল আছে। অধরা আমার কে ? এ প্রশ্নের উত্তরে রবি ঠাকুরের মতো করে আমারও বলতে ইচ্ছে করে-‘সুরবালা আজ তোমার কেহই নয়, কিন্তু সুরবালা তোমার কী না হইতে পারিত।’ রবি ঠাকুরের সুরবালার স্থলে অধরা নামটি প্রতিস্থাপন করলে বাক্যটি পুরোপুরি আমার হয়ে যায়। এক্ষেত্রে অবশ্য অধরার কোনো দোষ ছিলো না। সে তার বিয়ের দিনও বলেছিলো- চলো পালিয়ে যাই। কিন্তু আমিই তাকে অভয় দেই নাই। অমন একটা নিষ্পাপ মুখের নির্মল হাসি নিমিষেই চুপসে যাক এ আমি কখনো চাই নি। কখনো কখনো মনে হয় ভাতের অভাবের চেয়ে পৃথিবীতে বড় কোন অভাব নেই। এ কথা অনেকে অস্বীকার করলেও আমি বিশ্বাস করি। অধরা এখন অন্য মানুষ, অন্য মানুষের। আভিজাত্যে মোড়ানো তার জীবন। সে সুখে আছে ভাবতে ভালো লাগে। হয়তো, এখনো সে আমাকে ভালোবাসে। ঠিক যতটুকু ভালোবাসার নিয়ম আছে।

 

অধরা আমাকে একটি মুঠোফোন উপহার দিয়েছিল তার সাথে ফোনালাপের জন্য। যার বর্তমান ব্যালেন্স মাত্র এগারো পয়সা। ইতিপূর্বে সে আমাকে আরো একটি মোবাইল ফোন দিয়েছিলো কোন এক উৎসবে। সেটি বিক্রি করে একটি চাকরির দরখাস্ত করেছিলাম। এখানে একটা চাকুরির দরখাস্ত মানে চারিত্রিক সনদ, ব্যাংক ড্রাফট, ডাকটিকিটসহ ফেরত খাম, পাসপোর্ট সাইজের ছবি ইত্যাদি ইত্যাদি। যান্ত্রিক যুগে এসব ঝামেলা অনেকটা কমলেও খরচ কমে নাই। অতঃপর ইন্টারভিউ এর জন্য যাতায়াত, থাকা খাওয়া ইত্যাদি বাবদ যা খরচ হয় তার পরিমাণ খুব বেশি না হলেও আমাদের মতো বেকার যুবকদের দেউলিয়া করার জন্য যথেষ্ট।

 

অলস সময় কাটছে না। তাই শত সমস্যা উপেক্ষা করে বেরিয়ে পড়লাম কাজের সন্ধানে অথাৎ চাকুরির খোঁজে। আমাদের মতো মামা-খালুবিহীন মানুষগুলোর চাকুরীর খোঁজ করা মানে ব্যাংক ড্রাফটের টাকা অপচয়, জুতার তলা ক্ষয়, সময় নষ্ট, আর শরীরের কষ্ট ছাড়া কিছুই নয়। তবুও যদি দৈবক্রমে কিছু একটা পেয়ে যাই সেই আশায় পথ হাটছি। বের হয়েছি দশ টাকার একটি নোট নিয়ে যার গায়ে ময়লার দুগর্ন্ধ আছে। পায়ে হেঁটে চলছি সোজা ইলিয়ট ব্রিজের দিকে। প্রায় ঘন্টা খানেক হাঁটার পর গন্তব্যে পৌঁছলাম। ইলিয়ট ব্রিজের মাথায় শামীম কাকার সংবাদপত্রের দোকানে ঝুলানো গোটা বিশেক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে চোখ বুলালাম। দুই দুই চার টাকা দিয়ে দুটি বিজ্ঞপ্তির ফটোকপি কিনলাম। সেখান থেকে সোজা চললাম জুবলি ফটোস্ট্যাটে। যেখানে অনেক চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেয়ালে লাগনো আছে। এসব বিজ্ঞপ্তির বেতন কাঠামো দেখে ভালো লাগলেও চোখ আটকে যায় অভিজ্ঞতার কলামে। কোথাও পাঁচ বছর, কোথাও সাত বছর আবার কোথাও দশ বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। দেখে মনে হয় এ যেন বুড়ো চাকুরিওয়াদের চাকুরি।

 

ততক্ষণে দুপুর গড়িয়ে গেছে। ক্ষুধা ক্ষুধা অনুভব হচ্ছে। পকেটের অবস্থাও শোচনীয়। সম্বল বলতে কাছে আছে ছয় টাকা। কী করবো ভাবছি। এমন সময় নোংরা-জরাজীর্ণ পোশাক পরিহিত মধ্যবয়স্ক এক মহিলা এসে বলল- ‘বাবা কিছু সাহায্য করেন, না খাইয়া আছি। চারডো ভাত খামু।’ তার নিবেদন ভিতরে দোলা দেয়। হৃদয়টা হুহু করে ওঠে। কিন্তু পকেটের পুজি মাত্র ছয় টাকা। ছয় টাকা থেকে তাকে দুই টাকা দিয়ে দিলাম। অবশিষ্ট রইলো চার টাকা। একটি সস্তা চায়ের দোকানে গিয়ে দুই টাকায় একটি সিঙ্গারার সাথে ফ্রি এক গ্লাস পানি এবং দুই টাকার এক কাপ লাল চা খেয়ে অশান্ত পেটটাকে কিছুটা সান্তনা দিলাম।

 

এবার বাড়ি ফেরার পালা। পায়ে হেঁটেই ফিরছি। একটু পথ আগাতেই চোখে পড়ে খ্রিস্টান কবরস্থানে ক্রুশ প্রতিকৃতির বুকে লেখা-‘আমি পথ/ আমি সত্য/ আমি জীবন।’ মনে মনে ভাবলাম পথ, সত্য এবং জীবন কোনটির সংস্পর্শ পেলাম না। আরো একটু আগাতেই চোখে পড়ল কোন এক দেয়ালে লেখা আছে ‘মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে, হারা শশীর হারা হাসি, অন্ধকারেই ফিরেই আসে।’ মনে মনে ভাবলাম- এসব নীতিবাক্য শুধু মাত্র পুস্তকেই সীমাবদ্ধ থাকে। বইয়ের পাতা উন্মোচন করে কখনো জীবনকে স্পর্শ করে না।

 

হাঁটছি আর ভাবছি। যদি একটা ছোট খাটো চাকরি পেতাম তাহলে প্রথমে একটা বাড়ি, তারপর একটা গাড়ী তারপর একটা নারী....। এমন সময় হঠাৎ পায়ের নিচে একটা অস্বস্থি বোধ করলাম। লক্ষ্য করলাম পায়ের বার্মিজ স্যান্ডেল জুতার ফিতা ছিড়ে গেছে। যেন এক মহা সংকটে পড়লাম। পকেটে কোন টাকা নেই। উপায় না দেখে জুতা জোড়া হাতে নিয়ে হাটতে শুরু করলাম। রাস্তায় পরিচিত-অপরিচিত অনেকেই ঠাট্টা করে বলল- ভাই, ইলিশ মাছ জোড়ার দাম কত হলো।

 

বাবা পাটকলের শ্রমিক ছিলেন। এখন তার বার্ধক্য। গত এক যুগ হলো তাঁর কোন উপার্জন নেই। নিয়ম মোতাবেক এখন সংসারের দায়িত্ব আমার উপর বর্তায়। কিন্তু আমি এই বাস্তব সত্য বুঝেও বুঝিনা; শুনেও শোনার চেষ্টা করি না। চোখ-নাক-কান বন্ধ করে বধিরের মতো বসে থাকি। ঠিক বসে থাকি বললে ভুল হবে আমাকে বসে থাকতে হয়। এ যেন নিয়তির খেলা। অনেক কষ্ট-ত্যাগ স্বীকার করে কোনমতে বি.এ পাশ করেছি। সংসারের তাড়না বারবার তাগাদা দিচ্ছে। তাই উচ্চ শিক্ষার সমস্ত স্বপ্ন দুই পায়ে গুড়িয়ে নেমেছি কাজের খোঁজে।

 

পেশাগত জীবনের খোঁজে বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মনে হয় অর্জিত অতি সামন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সনদগুলো শুধুমাত্র কয়েক টুকরো কাগজ ছাড়া অন্য কিছুই নয়। জানি, ভালো কিছু হবে না হয়তো। তবুও হাল ছাড়ি নাই। মানুষ স্বপ্ন দেখে। স্বপ্ন ভাঙ্গে। তবুও স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। আমাদের স্বপ্নগুলো রাতের অন্ধকারে আসে আবার অন্ধকারেই চলে যায়। সূর্যের আলোয় কখনো জীবনকে স্পর্শ করে না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষায়-‘স্বপ্ন অপছন্দ হলে পুনরায় দেখাবার নিয়ম হয়েছে।’ তাইতো পুণরায় স্বপ্ন দেখি নাজিম হিকমতের কবিতায়-

দুঃখের ডালি

আজও উজাড় হয়নি-

কিন্তু একদিন হবে।

 

Post a Comment

0 Comments