নাজাতুল হক চৌধুর’র গল্প ~ সুভাষ ভালো নেই

The story of Najatul Haque Chowdhury ~ Subhash is not good



তমা,

জেনে খুশি হলাম ভালো আছ।আমিও বেশ ভালো।তোমার বিয়ের ৩৫ বছর হলো।আর পয়র্ত্রিশ বছর হলো তোমাকে দেখি না-কথা বলি না।তমা তুমি কি রাগ করেছো!রাগ করোনা তমা।তুমি তো জানো আমি এমনি।তোমার মতো এত সহজ হতে পারিনি আমি কোনোদিন।যদি সহজ হতে পারতাম তবে হয়তো নিয়তি আমাদের অনেক কিছুই বদলে দিতো।

আমি তোমার চিঠি পেয়িছি তমা।তবে স্বাভাবিক  ভাবেই কোনো জবাব আমি খুঁজে পাইনি।জানো তমা আমার এখন রাগ হয় খুব বেশি রাগ হয় নিজের উপর।দেখো তমা জীবন আমাকেও রাগ করতে শিখিয়ে দিয়েছে।কিন্তু কেনো রাগ হয় তা জানিনা।জানতে ও চাইনি কোনোদিন।তবু মাজে মাজে এই রাগের কারন আমার চোখের সামনে স্পষ্ট হতে শুরু করে।আমি তখন আরো রেগে যাই অন্যকিছু ভাবার চেষ্টা করি কিন্তু মাথায় অন্যকিছু আসে না।কবে থেকে শুরু হলো এই রোগ ঠিক  মনে আসছে না।আজকাল কিছুই তেমন মনে করতে পারিনা।চশমার কাঁচ টাও আরো ভারি হয়েছে।চোখে এখন আর তেমন দেখতে পাইনা।বয়সের ভারে সব কিছুই কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে তমা।তবে আমি দেখতে পাচ্ছি আমার দেয়ালে একটা টিকটিকি,পুরোনো একটা ক্যালেন্ককডার,ঘরের কোনে কিছু বইয়ের সমারোহ,আর তার পাশের বারান্দায় সিগারেট হাতে দারিয়ে আছে ইফাত।কি দারুণ শূণ্যতা।তোমার বিয়ের পর আমি আর সহ্য করতে পারিনি তমা।ভীষণ চিৎকার করতে মন চাইছিলো,মনে মনে এতটা নিঃসঙ্গ হলাম যে আয়নায় নিজেকে দেখলে ভয়ে আতকে উঠতাম।এক রাতে আমি মদ হাতে তোমাকে লিখতে বসেছিলাম,আসলে তোমাকে লিখতে বসেছিলাম বললে ভুল হবে।নিজেকে শান্তনা দিচ্ছিলাম।মদের বোতল থেকে দু ঢোক গিলে কাঁপা কাঁপা হাতে তোমার তুলনা করেছিলাম মদের বোতলের সাথে।লিখেছিলাম,

”মদ এবং আপনি আপনারা এক।এই যান্ত্রিক জীবনে ক্লান্ত হয়ে আমি আপনাদের কাছে আসতে পারি,তবে কিছু সময়ের জন্য।নেশা কেঁটে গেলে আমাকে ফিরতে  হবেই।”

কিন্তু আসলে কি জানো তমা,তোমার নেশা আমি কাটিয়ে উঠতে পারিনি কোনো যুগেই।তুমি আমার মস্তিস্কের পুরোটা দখল করে আছো।কাগজের লিখাটা ভুল।তুমি সত্যি বলেছিলে,তোমাকে ভুলে যাওয়া সে আমার সাদ্যের বাইরে।

তবে আমি কম চেষ্টা কিন্তু করিনি।বিরহের সাথে চুক্তি করে ছেরে দিয়েছিলাম তোমার শহর,আমার গ্রাম-ঘর।

সবছেরে ছুরে পা রাখলাম চট্রগ্রামে।ভেবেছিলাম নতুন জীবন শুধুই আমার,কিন্তু মস্তিস্কে ভর করে ছিলে তুমি।অবশেষ আমি শান্ত হয়ে গেলাম যখন চোখের সামনে ভালোবেসে মোচরে ভেঙ্গে যাওয়া একটি মানুষ দেখতে পেলাম।তাকে দেখে আমিও নিজেকে সামলে নিলাম।ইফাত। বাইশ-তেইশ বছরেরই এই যুবকের সাথে আমার দেখা হাসপাতালে।একশ তিন জ্বর নিয়ে যখন চোখ খুললাম,আমার পাশে আমার বলে কেউ ছিলো না।মাথা ঘুরিয়ে আশে-পাশে দেখতে থাকলাম।আমি যে ঘরটায় আছি সেখানে দশটা বেড,সবগুলোতেই ঝমঝম করছে রোগি।সবারই কেউ না কেউ আছে শুধু আমার নেই।থাকার কথাও ছিলো না,আমি তো সবাইকে ছেরে দিয়ে চলে এসেছি।আসলে তমা বাড়িতে আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো,যেখানে আমার ভালোবাসা কোনো মান পায়নি সেখানে পরে থাকা ভীষন যন্ত্রনা দায়ক।

মাথা ঘুরিয়ে ডান দিকে তাকালাম,আমার পাশের বেডে একটি মেয়ে তার ঠিক পায়ের দিকে শূণ্য দৃষ্টি নিয়ে বসে আছে একটি ছেলে।মেয়েটি হাসছে,কিন্তু ছেলেটি হাসতে পারছে না আবার কাঁদতে ও পারছে না।একসময় মেয়েটি হাসি বন্ধ করে ছেলেটিকে চলে যেতে বললো,সে যেতে চাচ্ছে না।মেয়েটি ধমকের সুর নিয়ে বললো,” তোমাকে যেতে বলেছি মানে যাবে।”

“একটু সময় থাকি।”

“যত থাকবে তত থেকে যেতে চাইবে,উঠ যাও।”

ছেলেটি চুপ করে বসে রইলো।

“এই তোমাকে না বলেছি কালো শার্ট পরবে না।”

“কেনো খুব বেশি খারাপ লাগছে?”

“সেদিন লেগেছিলো তবে আজ ভালো লাগছে।এখন যাও।”

ছেলেটি চলে গেলো।চলে যাওয়ার পর মেয়েটি উঠে বসলো,আকাশ রঙ্গা মেয়ে।তার মুখে এতোক্ষণ যে হাসিটা ছিলো সেটা আর নেই।একটু পর মেয়েটা কাঁদতে লাগলো। আকাশ যেন তুমুল বৃষ্টি ঝরাচ্ছে।

আমার জ্বর টা নেমে যাচ্ছে,চোখে স্পষ্ট ভেসে উঠছে পাশের বেডে আকাশ রঙ্গা মেয়েটি তার বেডের পাশের জানালার দিকে তাকিয়ে আছে।জানালার বাইরে বেলি ফুলের বাগান।আমি একটু উঠে বসলাম,মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললাম,”তোমার নাম কি?”

মেয়েটি ঘার ফিরে আমার দিকে তাকালো,তারপর ঠোঁটের কোনো হাসি এনে বললো,”নীলা।আপনার নাম?”

“আমি সুভাষ।”

“আপনি তো দেখছি শুধু ঘুমিয়ে থাকেন,কি রোগ আপনার?”

আমি সামান্য হেসে বললাম,”আমার তো কেউ নেই তাই ঘুম থেকে উঠতে ইচ্ছে হয় না।”

“আপনার কেউ নেই! কিন্তু তাতে কি জেগে উঠলে তো আমিও একটু গল্প করতে পারতাম আপনার সাথে।”

“তোমার কি রোগ?”

মেয়েটি এভার খুব হাসলো তার পর সামান্য গম্ভির হয়ে বললো “আমার কোনো রোগ নেই,আমার হলো মৃত্যু,নিশ্চিত মৃত্যু।”

আমার চোখ আবার বন্ধ হয়ে গেলো,রাজ্যের ঘুম নেমে এলো চোখে,বসা থেকে ধীরে ধীরে গাঁ এলিয়ে দিলাম বিছানায়।

নিলার কথার আওয়াজ শুনতে পারছি,চোখ খুলে তাকালাম হ্যাঁ নিলাই তো।পাশের বেডে ঠিক গতদিনের মতো করে নিলা হাল্কা মাথা তুলে শুয়ে আছে আর সেই ফ্যাকাশে চেহারার মানুষ বসে আছে তার পাশে।আমি স্পষ্ট তাদের কথা শুনতে পাচ্ছিলাম,নিলা বলছে,”এই তুমি আমাকে বিয়ে করবে না!চলো আমরা বিয়ে করে ফেলি।একদম লুকিয়ে যাতে কেউ টের না পায়।করবে তো।

“করবো।আগে তুমি সুস্হ হয়ে উঠো।”

“উঁহ।আমি কখনো সুস্হ হবো না,আমি সুস্হ না হলে কি বিয়ে করবে না?”

“আমি অরকম বলিনি,আর তুমি অবশ্যই সুস্হ হয়ে উঠবে।”

নিলা এবার একটু হেঁসে বললো,”আচ্ছা ঠিক আছে।”

“তোমাকে আজ মেঘপরি দের মতো লাগছে।”

“এই যে মিস্টার বানিয়ে বানিয়ে কথা বলবে না,আমি কিন্তু এসব ধরতে পারি।”

“আচ্ছা বলবো না।কিন্তু আজ তোমাকে মেঘ পরিদের মতোই লাগছে,আমি সত্যি বলছি।”

“আচ্ছা।কিন্তু আমি তো এরকম থাকবো না,কদিন পরেই আমার চেহারা বিকৃত হয়ে যাবে,চামরার রং ঝরে যাবে,চুল কেঁটে ফেলবে,তখন আর মেঘপরি লাগবে না।”

“এরকম কিছুই হবে না,তুমি খুব শিগ্রই সুস্হ হয়ে উঠবে।”

“আচ্ছা শোনো তুমি তো আমাকে কখনো ছুঁয়ে দেখোনি,তোমার আমাকে ছুয়েঁ দিতে ইচ্ছে হয়না?”

ছেলেটি চুপ করে রইলো।নিলা এবার খুব নরম স্বরে বললো,”আমাকে একবার জরিয়ে ধরবে ইফাত?”

ইফাত তাকে জরিয়ে ধরে বসে আছে।তারা দুজনে কাঁদছে।ইফাতের চোখের জল গরিয়ে পরছে নিলার পিঠে।একটু পর নিলা শান্ত হয়ে ইফাতকে ছেরে দিলো।

“ইফাত তুমি চলে যাও।”

“আর একটু থাকি।”

“না তুমি থাকবে না,থাকলেই আমার জন্য তোমার মায়া বেড়ে যাবে।তোমার মায়া বাড়তে দেয়া যাবে না।”

“আমি চলে গেলে ও আমার মায়া কমবে না।”

“তুমি যাও তোমার কান্না দেখলে আমার কষ্ট হয়,তুমি পরে এসো এখন যাও।”

ইফাত চলে যেতে থাকলো নীলা আবার বললো,”শোনো!”

ইফাত ঘুরে দাঁরালো।

নিলা বললো,”আমাকে বিয়ে করতে হবে না।আমি ঠাট্টা করছিলাম।এখন যাও।”

একটু পর আমি উঠে বসে নিলাকে জিগ্যাস করলাম“কেমন আছ মা?”

“আমি সব সময় ভালো থাকি চাচা।আপনি কেমন আছেন?”

“ভালো।”

“কাল তো একেবারে মনে হলো জ্ঞান হারিয়েছিলেন!।”

“আরে তেমন কিছু না ঘুম আসছিলো খুব।”

“আজও কি ঘুম আসছে নাকি শেষ!”

আমি সামান্য হেসে বললাম “শেষ।”

“তাহলে ভালোই হলো আপনার সাথে গল্প করা যাবে।”

“তা করা যায়,তবে গল্পের ফাঁকে ডাক্তার রা এসে ভাগ নিবে।”

“ঠিক বলেছেন।এদের এখন আর আমার ভালো লাগে না।”

“কেনো লাগেনা! উনারা তো যা করছেন আমাদের জন্যই।”

“তা ঠিক কিন্তু যেখানে চিকিৎসায় কাজ হবে না সেখানে এতো আদিখ্যেতা করে কি লাভ!”

“চেষ্টা চালাতে তো আর বাঁধা নেই!”

“এই যে ভুল বুঝলেন চাচা।উনারা আসলে চিকিৎসার চেষ্টা করছেন না।উনারা মানসিক ভাবে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করে নিচ্ছেন।এই যেমন ধরুণ,আমি জানি আমার চিকিৎসায় কাজ হবে না,ডাক্তার ও জানে।সে জন্য তারা আস্তে আস্তে আমাকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করে নিচ্ছে,যেন আমি মৃত্যু নিয়ে কষ্ট না পাই।কিন্তু আমিতো মরেই যাবো আমার কষ্ট না পাওয়ার জন্য এসব করতে হবে কেনো!এসব করবে আমার প্রিয় মানুষের জন্য,যে আমার খুব কাছের,আমার মৃত্যু তে যারা কষ্ট পাবে তাদের জন্য।এই ধরুণ ইফাতের জন্য।”

“এরকম বলো না ,তুমি নিশ্চই সুস্থ হয়ে উঠবে।নিজেই যদি সবসময় মৃত্যু কামনা করো তাহলেই মৃত্যু না হলে তুমি সুস্হ।”

“নিজেই মৃত্যু কামনা করছি না চাচা,ভেতরে ভেতরে আমি প্রচুর বাঁচতে চাই।ইফাতকে নিয়ে বাঁচতে চাই।”

“ইফাত! যে তোমাকে দেখতে আসে!”

“ওহ ইফাতের কথা তো আপনাকে বলাই হয়নি,জ্বী ওই রোগা করে ছেলেটাই ইফাত।ও অনেক ভালো ছেলে চাচা।আমাকে অনেক ভালোবাসে।কিন্ত একটু বোকা টাইপের।”

“আচ্ছা।তাহলে তুমি ওঁকে ওমন তারিয়ে দাও কেনো!”

“ওঁকে নিয়ে আমার ভয় হয় চাচা।ও অনেক সহজ সরল,এই পৃথিবীতে আমি ছারা ওর কেউ নেই,ওঁকে দেখলে আমার এখনো বাচ্চা মনে হয়।আমাকে ও ভুলতে পারবে না,আমাকে ছারা কিভাবে থাকবে সেটাই বুঝতে পারছি না।সে জন্য আমি চাই সে আমাকে ভুলে যাক।”

আমি চুপ করে রইলাম।নীলা গম্ভীর হয়ে আছে।আস্তে আস্তে শুয়ে পরতে পরতে আমাকে বললো,”চাচা আমার ঘুম আসছে,আমি এখন ঘুমিয়ে পরবো।আপনি ও ঘুমান।”

“শোন,তোমাকে আজ সত্যি সুন্দর লাগছে।আর ইফাত নামের ছেলেটাকে ওমন তারিয়ে দিয় না।যতক্ষন থাকতে চায় থাকুক ও,বাড়ুক না মায়া,মানুষ হয়ে যখন পৃথিবীতে জন্মেছে সে বড় নিশ্চই হবে,সবসময় তো আর বাচ্চা থাকবে না।”

নীলা শুয়ে চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকালো।তারপর ঘুমিয়ে পরলো।সেই মুহুর্তে আমার মনে হয়েছিলো ইফাত নামের ছেলেটা যদি এখন নীলার পাশে থাকতো তবে তাদের দুজনকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দেখাতো।

চোখ খুলতেই দেখলাম নীলা চুল নেই।তার চুল কেটে ফেলা হয়েছে।

সে বললো,”সুন্দর লাগছে চাচা?”

আমি একটু উঠে বসলাম,নীলার পাশে বসে আছে তার বাবা।আমি একটু হেসে বললাম,”দারুণ লাগছে।তোমার ঘুম কেমন হয়েছে?”

“আমি তো ঘুমাই না চাচা,ঘুমাতে একদম ভালো লাগে না।”

নীলার বাবা মাথা নিচু করে বসে আছেন,তার চোখে জল।জল দেখেই বাবার উদ্দেশ্য সে বলে উঠলো,”বাবা তুমি কাঁদছ কেনো?আমাকে নিয়ে একদম কাঁদবে না।কাদাঁর মতো কোনো কিছু এখনো ঘটেনি।”

বৃদ্ধ লোক এর চোখ বেয়ে জল গরিয়ে পরছে।নীলা আবারো বললো,”জানো বাবা ভেবেছিলাম যেদিন তোমার সাথে দেখা হবে অনেক গুলো কঠিন কথা তোমাকে বললো।কিন্তু এখন আর বলতে ইচ্ছে করছে না।দেখো বাবা আমার সুন্দর চেহারা আর সুন্দর নেই,চোখের নিচে কালি পরে গেছে মাথার চুল কেটে ফেলতে হয়েছে কি কুৎসিত লাগছে তাইনা!”

বৃদ্ধ লোকটি নীলা কে জরিয়ে ধরে কাঁদছেন,নীলার চোখ দিয়েও জল গরিয়ে পরছে।পরক্ষনে নিলা নিজেকে সামলে নিয়ে বাবাকে ছেরে দিয়ে বললো,”চলে যাও বাবা,ভালো থেকো।আমাকে আর দেখতে আসবে না তুমি।”

“এখনি চলে যাবো!এমন বলিস না আমাকে ক্ষমা করে দেয়।”

“বাবা হয়ে মেয়ের কাছে ক্ষমা চাইতে হয়না।তোমার প্রতি আমার আর কোনো অভিযোগ নেই।এখন তুমি যাও আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ আসবে।

 নীলার বাবার চলে যাওয়াটা দৃশ্যটার দিকে নীলা অপলক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলো।তারপর একটা দৈর্ঘশ্বাস নিয়ে তাকালো আমার দিকে।

“চাচা ইফাত ছেলেটাকে আপনার কেমন লাগে?”

“ভালো।সে হচ্ছে একজন প্রেমিক পুরুষ।”

“ঠিক বলেছেন।আজ সকালে সে কি করেছে জানেন,সে কাজি নিয়ে এসেছে আমাকে বিয়ে করবে,অনেক কষ্টে তাকে ফেরত পাঠালাম।এখন যদি আবার নিয়ে আসে আমি কিন্তু আর পারবো না রাজি হয়ে যাব।আর আপনি হবেন সাক্ষি।”

বলেই নীলা হাসতে লাগলো।তার পর আবার বললো,”চাচা আমাকে কেমন লাগছে?”

“তোমাকে বেলি ফুলের মতো সুন্দর লাগছে।”

নীলা খানিক গম্ভির হয়ে রইলো তারপর বললো,”একটু পর ইফাত আসবে,ওর কেউ নেই চাচা,আমি মারা যাওয়ার পর আপনি ওঁকে বিয়ে দিয়ে দিবেন।এই দায়িত্বটা আমি আপনাকে দিলাম পারবেন না চাচা!”

তমা বিশ্বাস করো আমার চোখে তখন জল,যেমন করে তোমাকে ছেরে আসার পর আমার যন্ত্রনা হচ্ছিলো তারচেয়েও বেশি কষ্ট অনুভব করছিলাম আমি সেই মুহুর্তে।আমি কিছু বলার আগেই ইফাত চলে আসলো।নীলা ইফাতকে দেখে বললো,”কেমন আছেন মিস্টার?”

“ভালো।তুমি কেমন আছো?”

“আমি ভালো।তোমাকে বলেছিলাম না এখানে আমার একজন চাচা আছেন শুধু ঘুমান,ওই যে আজ জেগে আছেন।

বলেই নিলা সামান্য হাসলো।ইফাত আমাকে সালাম করে বললো,”কেমন আছেন?”

“ভালো।তুমি কেমন আছো?”

“ভালো চাচা।”

এর মাজেই নিলা ইফাতের দিকে তাকিয়ে বললো,”আমি মারা যাওয়ার পর তুমি চাচার খেয়াল রাখবে। উনারো কেউ নেই।”

মুহুর্তেই সবাই গম্ভীর হয়ে গেলাম।তমা আমার মনে হচ্ছিলো জগতের সবচেয়ে বড় অন্যায় হচ্ছিলো।এই মেয়েটি বেঁচে থাকার প্রয়োজন প্রচুর,এমন ফুলের মতো হাসিখুশি মেয়ের সাথে খোদা অন্যায় করছেন।সেদিন নীলা আর ইফাত খুব গল্প করছিলো,সেই দৃশ্যেযে কতটা দারুণ তমা তুমি ধারনা করতে পারবে না।চোখ বন্ধ হওয়ার শেষ মুহুর্তে দেখলাম নীলা কাঁদছে,ইফাতকে জরিয়ে ধরে কাঁদছে।

চোখ খুলার পর দেখলাম আমার পায়ের পাশে বসে আছে ইফাত।পাশের বেডে কেউ নেই।আমি উঠে বসতেই ইফাত বললো,”চাচা কেমন আছেন?”

আমার মাথা ভার ভার লাগছে,নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,”ভালো।তুমি কেমন আছো?”

ইফাতের চোখ বেয়ে গরিয়ে পরছে জল,নীলার শূণ্য বেডের দিকে তাকিয়ে সে বললো,”আপনি আজ দুইদিন পর ঘুম থেকে উঠলেন,আপনার অবস্থা খারাপ হচ্ছিলো দেখে আপনাকে ঘুমের ইনজেকশন দেয়া হয়েছিল।তবে আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন কদিনের মাজেই।”

আমার গাঁ কাপছিলো তমা।সেদিন আমাদের দুজনের একজন ও নিলাকে নিয়ে কথা বলিনি।ইফাতের মনের সেই শূণ্যতা,নীলার না থাকা আমাকে ছুয়েঁ দিচ্ছিলো বার বার।এর পর ইফাত ছেলেটা রোজ আমাকে দেখতে আসতো।পায়ের পাশে বসে তাকিয়ে থাকতো নীলার বেডের দিকে।

আজ নীলা মারা যাওয়ার এক বছর তিন মাস।আঁর আজ ইফাতের বিয়ে।ছেলেটা এখনো আমার রুমের ব্যালকুনিতে দারিঁয়ে আছে।আজ আমার মন বড় খারাপ তমা,ইফাতের বিয়েটা যেমন সে নিতে পারছে না তেমনি নিজের ভেতরে কোথায় যেন একটা সুক্ষ দাগ কেটে বেরাচ্ছে আমারো।শরীরটা অবশ হয়ে আসছে তমা।আজকাল আর কিছুই ভালো লাগে না।আজ আমার মন ভালো নেই তমা,আজ আমি ভালো নেই।তুমি ভালো আছ জেনে খুশি হলাম।তবে তোমাকে দেখতে আসার মতো শক্তি আমার আর নেই।ভালো থেকো তমা।আর তোমার মেয়েকে আমার ভালোবাসা দিয়।

ইতি

সুভাষ।




নাজাতুল হক চৌধুর


Post a Comment

0 Comments