যে লেখে সে প্রথমে নিজের আনন্দের জন্যই লেখে, যখন লেখা শেষ হয়ে যায় তখন তা আর নিজের থাকে না; তা হয়ে যায় জগত সংসারের—আরাধ্য পাঠকের। এইরূপ লেখাই চিরন্তন বয়ে যায়—সমুদ্রের ঢেউয়ের মতন আছড়ে পড়ে তীরে, তৈরি করে আরও নানান ঢেউসুধা। ঢেউয়ের পর অজস্র ঢেউয়ের সমাহার...। একটা সার্থক লেখাও মহাকালের ঢেউয়ে মিশে সৃষ্টি করতে পারে নানান স্রোত, নানান অর্থের দ্যোতনা। ধ্বনিব্যঞ্জন।
কবিতা যে আসলে কি, তা ভাবতে গেলে তার আর সার্থক কোনও পঙক্তিই রচিত হয় না! তাই কবিতা কি তা ভাবার চাইতে কাব্যের রশদ ভাবনাই ডুবে যাওয়াই বরং ভালো। এতে করে একটা সার্থক কবিতা পঙক্তি রচিত হলেও হতে পারে! কবিতা কি, ভাবার চেয়ে—আমার কাছে একটা ছোট বাচ্চার কাছে চকোলেটের কী মূল্য তা ভাবতে পারা অনেক সহজ কাজ বলে মনে হয়! কবিতার যে নন্দন তত্ত্ব তা ঐ চকোলেট পাওয়া ছোট বাচ্চার আনন্দের কাছে নিতান্তই গৌণ। কেননা যে কিশোর ইস্কুলে কবিতা আবৃত্তি করে বা বাসায় মা'কে সুর করে কবিতা শোনায় তা যতটা না নিজের কাছে আনন্দ তার চেয়ে বেশি অন্যকে আনন্দ দিতে পারায়। এখানেই বোধকরি শিল্পের চরম মাধুর্যের সার্থকতা। ভাবমাধুর্যই এখানে প্রধান হাতিয়ার।
কবিকে হতে হয় ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। আজকে বসেই লিখতে হয় আগামী দিনের কবিতা। একমাত্র নতুন কবিতাটিই তাকে লিখতে হয় যা এর আগে কেউ লিখেনি কখনো। নতুন নতুন দর্শন তাকে আবিষ্কার করতে হয় যে দর্শনের কথা কেউ আগে চিন্তাও করেনি।
সৃষ্টির শুরু থেকেই কবিতা সাধন করে আসছে মানুষ! মানুষের আছে আত্মজিজ্ঞাসা। এ জিজ্ঞাসা মানুষকে দিয়ে কবিতা লিখিয়ে নেবে। মানুষের আছে সেই সৃষ্টিশীলতা আছে অন্তরের অনুরণন আর তা আছে বলেই সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ অবধি কবিতা সাধন করে যাবে মানুষ।
২.
মানুষ জীবন বড় আনন্দের এরচে' বড় আনন্দের আর কিছু হতে পারে না! শৈশবে যখন খুব একা হয়ে যেতাম—প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে বা নদীর কুলকুল বহমানতার দিকে চেয়ে ভাবতাম—কেন এই বৃথা মানুষ জন্ম! মনটা বেশ বিষণ্ন হয়ে থাকতো। মানুষ জন্ম, সৃষ্টি রহস্য এসব ভেবে তখন খুব ইচ্ছে হয়েছিল সন্ন্যাস জীবন বেছে নিতে—সিদ্ধার্থের মতো বাড়ি থেকে পালাতে।
কবিতা লিখতে এসে সেই সন্ন্যাস জীবনই যাপন করছি একপ্রকার! জীবন থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি এখনও। লেখালেখি করে আসলে কী হয়? কিছুই হয়তো হয় না, তবু কী এক অমোঘ তাড়নায় মানুষ লিখে চলে আজীবন! এই হতাশা আমাকে একসময় উম্মাদ করে রেখেছিল! শূন্য দশক থেকে লেখালেখি শুরু করলেও মাঝখানে টানা সাত বছর কিছুই লিখিনি। একটি শব্দও না! হতাশা—অবসাদ—সাহিত্যের প্রতি অভিমান এক সময় আমাকে বিষাদে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল! ঐ সাত বছরে মনে হয়েছিল আমি আর কখনো লিখতে পারবো না! কিন্তু শেষপর্যন্ত কবিতা আমাকে ছাড়ে নি! মাঝেমধ্যে এমনও মনে হয়েছে যে, আমি হয়তো নতুন কিছু লেখার জন্য সময় নিচ্ছি! নতুন কবিতা। যা আমি আগে কখনো লিখিনি। আমার নিজস্ব একটা স্বর, একটা সিগনেচার রাখতে চাইছিলাম হয়তো-বা।
যেহেতু আমি সন্ন্যাস জীবন বেছে নিতে পারিনি, তাই আমাকে লিখতে হয়েছে কবিতা। প্রতিটি মানুষের একটা নিজস্ব জগত থাকে, একটা বাউলিয়াপনা থাকে। কেউ তা প্রকাশ করতে পারে কেউ তা পারে না। একজন রিকশাচালকও দিনশেষে গুনগুন করে গান গেয়ে বাড়ি ফেরে, একজন মাঝি নদীতে নাও ভাসিয়ে ভাটিয়ালি গায়...। চিত্তের আরামের জন্য মানুষ এসব করে। এতে করে সে প্রশান্তি পেতে চায়। কবিও তেমনি মনের প্রশান্তির জন্য তার অব্যক্ত কথাগুলো প্রকাশ করতে চায়। একজন কবি দিনশেষে তার যে ক্ষরণ তার ভাষার মাধ্যমে তা জানিয়ে দিতে চায়। আমিও যেহেতু কবিতা লিখি—আমার যে ক্ষরণ, চারপাশের মানুষের বেদনা, উত্থান-পতন, মানবসভ্যতা, প্রকৃতি, ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি, পুঁজিবাদ, রাষ্ট্র, ক্ষমতা, বৈষম্য, নারী... ইত্যাকার বিষয়গুলো আমাকেও ভাবায়। আর এসব ভাবনা আমার হাত ধরে কবিতা হয়ে উঠতে চায় বলে আমি এর একটা ভাষা ও গঠনরূপ দেয়ার চেষ্টা করি। কবিতা আমার কাছে একটা নিতান্তই বোধের আরাম। রিপ্রেশ থাকা, ঝরঝরে থাকা। চিরপ্রশান্তি যেন-বা। বা অনেক দুঃখের পর একটু কান্নার আরামের মতো। কবিতা এমন, আকাশ যখন গুমোট থাকে, গরমে অস্থির হয়ে পড়ে চারপাশ তখন মুষলধারে একটুখানি বৃষ্টি একটা শীতল আনন্দের পরশ বুলিয়ে দেয় যেন! বা গহীন অরণ্যে হাঁটতে হাঁটতে একদল তৃষ্ণার্ত মানুষের হঠাৎ ঝরনার দেখা মেলার মতোই আনন্দ! কিংবা কোনো নাবিক দিনের পর দিন অথই সমুদ্রে দিশা হারিয়ে আচমকা বাতিঘরের সন্ধান পাওয়ার মতই আনন্দ! কবিতা এমনও, গহীন অরণ্যে পথ হারা পথিককে পাতার ফোকরে একটুখানি লাজুক রোদের রশ্মি ফেলে আলোর সন্ধান দেয়ার মতো।
কবিতায় কী লিখতে চেয়েছি আমি! আমার 'মানুষ' যাপনই আমি কবিতায় তুলে আনতে চেয়েছি বরাবর। নদীর কুলকুল ধ্বনিব্যঞ্জন, কোকিলের কুহুতান, মেঘের শুভ্রপুচ্ছের ওড়াউড়ি, সমুদ্রের প্রতিটি ঢেউস্বভাব এসবও তুলে আনতে চেয়েছি কবিতায়। আর চিরকাল মানুষের কথা। মানুষের মুখ আঁকতে চেয়েছি বরাবর। সারাজীবন মানুষের মুখ পাঠ করতে চেয়েছি! মানুষের মুখের মতো সত্য কিছু নেই। মানুষের মুখ মিথ্যে বলে না! সেই মানুষের মুখাবয়ব আমি শব্দে শব্দে আঁকতে চেয়েছি আজীবন। মানুষের হৃদয়ের কান্না, হতাশা, না পাওয়ার বেদনা আমি ধরতে চেয়েছি। তা করতে গিয়ে কখনো কখনো আমার নিজের কথাও বলা হয়ে গেছে অনায়াশে। এই আঁকতে গিয়ে বুঝেছি, মানুষের ভেতরে একটা চাপা ভায়োলিন বেজেই চলছে অনবরত!

0 Comments