আমরা যা কিছু দেখি, শুনি, ঘ্রাণ করি, আস্বাদ করি সবই বাইরের। তাই নিয়ে রূপ-রস-গন্ধ ভরা আমাদের বহির্জগৎ। বিপরীতে আমাদের আমিত্ব, আমাদের চিন্তা, স্বাধীন ইচ্ছা, আমাদের স্বপ্ন, রসাস্বাদন, আমাদের সমস্ত অনুভূতি-এসব আমাদের অন্তরের। বাহিরের এ জগতের আধিপত্য করে প্রকৃতি। অনু-পরমাণু থেকে শুরু করে প্রকাণ্ড এই বিশ্বচরাচরের সর্বত্র চলে তার শাসন। কিন্তু আমাদের মনোময় অন্তর্জগতে খাটে আধ্যাত্মিক নিয়ম। সেখানে চেতনা, জ্ঞান, অজ্ঞান, প্রেম, বিরহ, ভক্তি, ক্রোধ, বিদ্বেষ, আশা, নিরাশা, আনন্দ, নিরানন্দ, লজ্জা, অভিমান-এসবই বিরাজ করে। বস্তুত আমাদের এই মনোময় জগৎ প্রতিফলিত হয় ভাষায়, সাহিত্যে, সঙ্গীতে, শিল্পে।
প্রযুক্তির বিশাল অগ্রগতিতে মানুষের জীবন, ভাষা আজ বহুরৈখিক। বাক্যের মধ্যে আড়ালে গোপনে জন্ম নিচ্ছে নতুন এক বাক্য। কবিতা-সত্যিই সে এক আশ্চর্য আ্যালকেমির ফল। বাস্তবতার যেমন একটা নির্দিষ্ট জগৎ আছে তেমনি অ-বাস্তবতার এক বিশাল অনির্দেশ্য জগৎ আমাদের আড়ালে নিজে নিজে কাজ করে চলেছে। কবিতার জন্য এই দু’য়েরই অসম্ভব দরকার। এই দুই জগৎই পরস্পর সমান্তরাল চলেছে, তবু কেউ কারুর পরিপূরক নয়।
প্রবাহমান মৃদুলা এই শীতে ধীরে-ধীরে কবিতার মধ্যে নিসর্গ হচ্ছে দ্রবীভূত। প্রকৃতি রূপান্তরিত হয়ে কবিতায় ঠাঁই নিচ্ছে প্রতিটি কবির বুকের গভীরে। নিঃশ্বাসে অসীম থেকে খবর এসেছে, অচেনা দরদালানে হাঁসের পালকের নিচে ঘুমিয়ে আছে কবিতা। দেহে তার রাতুলের ছটা। দূর থেকে এসবই আঁচ করতে পারে একজন কবি। পৃথিবীর রূপ, রস, গন্ধ, বর্ণ গায়ে মেখে তিনি ফুটতে চান অপরাজিতা ফুল হয়ে। দূরে মেঘের কার্নিশে মিলিয়ে যাবার আগে তবু তিনি বলে যান-তোমরা কি আসবে না? নির্ভুল ফুলের টানে, ওগো প্রজাপতি?
অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম অনুভূতি, নানা ইন্দ্রিয়-অভিজ্ঞতা যেন ভাষায় মূর্ত হয়ে ধরা দেয় কবিতার পরতে পরতে। এবং কে না জানে, অনুভূতির ভাষাই শাশ্বত, সর্বজনীন। বুদ্ধি ও যুক্তির ভাষা যেখানে গিয়ে হয়ে পড়ে অকার্যকর, সেখান থেকে শুরু হয় অনুভূতির ক্রিয়া; শুরু হয় লীলা, অনুভূতি আর অনুভূতিময় ভাষার।
কবিতায় কবির নিজস্ব ভাষা, স্বর, সুর বহন করাটা জরুরি, গোপন গুপ্ত রোগের মতো নিজেরই অজান্তে। কুহক-ছড়ানো রূপময় ল্যান্ডস্কেপে দাঁড়িয়ে তিনি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েন আমাদের নীরব নিউরনে।
পাইন গাছের মতো সকল শীত আর কুয়াশাকে ভেদ করে সে তার মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেই। আর আমরা কি তা দেখবো না? নাকি ঈর্ষাকাতরতায় অযথাই হোঁচট খেতে খেতে বেহায়া, বেহিসাবী স্বজনের মতো দূরে সরে যাবো! কবিতা-দূরে নয়, নিকটে, ঘন হয়ে বসার বাঞ্ছা পোষণ করে। আপন ঋতুতে এসে জ্যোৎস্নায় স্নাত হয়ে দূরে যে রয়েছে কবি, তাকে ডাকে। হাতছানি দিয়ে বলে-এসো, বসন্তের এই অরণ্যে, আমাদের প্রাঙ্গণে। সব যুক্তির জোয়ার থেকে পাথরকে এনে রূপান্তরিত করি পারদে।
কবির বিশুদ্ধ গহনরাজ্য থেকে অশুভ সংঘাতে দীর্ণ জাগতিক বিশ্বের দূরত্ব কতটুকু? একজন কবি এই দুই বিরোধী প্রান্তরের ভিতর বিচরণ করেন কি করে? এ এক প্রশ্ন বটে! আমরা নিজস্ব স্বরলিপির ধূন তুলে বিমোহিত করি পাঠক প্রজাতিকে। কবিতায় প্রশ্রয় দেই প্রেম, প্রকৃতি, হিংসা, শ্লেষ কখনো দ্রোহে কখনো বিদ্রোহে জ্বলে উঠেছে সৃষ্টির গহনে। কবিতার ধ্বনি ও বর্ণের অন্তহীন ঐকতান এতটাই জোরালো হয় মানবের মৃত্যুকেও বুঝি তা রোধ করতে পারে। কবিতা দেখাবে আগামীর পথপরিক্রমা। কাব্যের নিভৃত প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলে দেখা যায়, কত কত সংগ্রামের সঞ্জীবনী আহরণ। সেখানে কোনো আপোস নেই, নেই কোনো সন্ধি। শিল্পের অন্ধিসন্ধির তালাশ করি সবরমতি সন্তের মতো। অথচ হৃদয়জুড়ে জ্বলজ্বল করে লাল অক্ষরের এক ও একান্ত শব্দ-‘ভালোবাসা’। জননীর মতো, সখার মতো কবি ছুটে আসেন বারবার তার কাব্যকলোনির মাঝে। খানিকটা অনাথ বালকের মতো মাথা তুলে ইশারায় বলতে চান, আমাকে পড়ো। ওগো আয়েসী বিলাসিনী, তুমি কী পড়বে না, ধরবে না তুলে আমার কবিতা তোমার দেহশীর্ষে?
চূড়ান্ত সংকটের মুহূর্তেও জেগে থাকে আমাদের আস্থার পর্বগুলো। এই এত এত অর্থ, বন্ধু-পরিজন, স্বয়ং ঈশ্বর-সব যখন ব্যর্থ হয় তখন মানুষ কোথা থেকে শক্তি পায়? জীবন নামক হটকারী বিশৃঙ্খল স্রোত-প্রতিস্রোতে কে জোগায় বাঁচার মন্ত্র?
আমাদের অনুভূতিময় জীবনভাষার ভেতর, জল স্থল আকাশ থেকে মহাকাশ প্রতিটা অনিবার্য থাকার ভেতর আমরা খুঁজে ফিরি একটি শব্দ, একটি বাক্য যা সময়কে লেহন করে গুপ্ত পরম্পরায় দর্শনের দরদ দিয়ে, সকল প্রসন্নতা নিয়ে শরীর তথা মস্তিষ্কের সীমানাকে টপকে তিল তিল করে জমা হয় কবিতার ওয়্যারহাউসে। একজন কবি যিনি আক্ষরিক অর্থেই তার সন্ধান পান হয়ে ওঠেন তার সংগ্রাহক, তখনই মায়াবী মুক্তির পথ তার সামনে এসে হাজির হয়।
যেন অনাবৃষ্টির দেশে বিছিয়ে রেখেছে জলের খাতা, আর তাতে স্রোতের পরে স্রোত এসে বসিয়ে দিয়েছে সুসজ্জিত অক্ষরমালা। কবিতা তেমনই এক পিচ্ছিল প্রবাহপাথর। আগুনে আঙুল ভিজিয়ে আমরা আঘাত করি, কবিতার মধ্যে দিয়ে সকল পড়ন্ত পাতাগুলোকে ফের তার বৃন্তে ফেরাতে চাই। চাই-ইট, কাঠ, কংক্রিটের প্রলেপ ভেদ করে সাধু ও সাধের কাব্যরসে সকল পাঠক শেণিকে ডুবিয়ে রাখতে। আমাদের একটাই বাসনা, চাওয়াকে পাওয়াতে রূপান্তরিত করতে বলতে চাই-ওগো কবিতা! তুমি ঝড় জল ও রৌদ্রে সহ্যশীল হও। আমরা জানি, কবিতা তার নিজস্ব মহিমায় নিজেকে ব্যাপ্ত, উদ্ভাসিত করে তুলতে জানে; কবিতা আলোকিত করে পরিমণ্ডল; উদ্বুদ্ধ করে-আন্দোলিত করে-আনন্দিত করে-আনে হৃদয়ে আমাদের সঞ্জীবনী সুধা; নিজে ফোটে অন্যকে ফোটায় তার সৃজনপ্রতিভার কৃতিত্বে। কাজেই তাকে পাঠ করতে হবে একটি বিন্দুতে দাঁড়িয়ে, নিসর্গের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে।
প্রকৃত কবি তিনি, যিনি নিরঞ্জন পৃথিবী থেকে, মুকুলের গন্ধ থেকে, হাঁসের পালক থেকে ছিটকে যাওয়া রোদেলা রাংতাটুকু ব্রহ্মচারীর মতো খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্তিতে ক্লিষ্ট হতে চান। উচ্চাঙ্গের উৎকণ্ঠা, ব্যক্তিত্বের সরল ঋজু রেখা থেকে দৃষ্টি ফেরালে মনে হবে, কবি যেন সমুদ্রে ভেসে থাকা বিরাট আর নির্জন এক মাস্তুল।
হাজারও টানাপোড়েনে অবলীলায় স্মিতচিত্তে আনোখা ইয়ার্কিতে একজন কবি তার নতুন নতুন কবিতার আকরগুলো উড়িয়ে দেবে, যা মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়বে আমাদের দুধপথে। কবি হল সত্যিকারের সেই অকিঞ্চন পিঁপড়ে যে ক্ষুদ্র আধার হয়েও জমাট মধুর স্ফটিক কণা খুঁজে খুঁজে খুটে আনে।
ভাবতে ভালো লাগে, আমাদের হৃদয়-নিংড়ানো কথাগুলো, ভাবনাগুলো লাফিয়ে উঠছে দ্রুত। ফসফরাসের মতো সাদা আর নীল দাঁত দিয়ে ছোবল মারছে নৈঃশব্দের গায়ে। সত্যিকারের কবি যেন সার্কাসের সেই বাঘ যে কিনা জীবন মুত্যুকে মুঠোয় বন্দি করে অবলীলায় লাফ দিতে পারে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের রিঙে!
ভাবনা আসে, ভাবনা যায়। ঘুরে ঘুরে দেখি কত চুমকি মাখা গাছ, তাদের ছায়ায়, আড়ালে-আবডালে গুচ্ছের মতো কবিরা সবুজ সহজ হয়ে আছে হিজলের গন্ধ মাখা শার্ট ও শাড়ি পরে। যেখানে শস্যহীন মাঠের শিয়রে চাঁদ এসে চুপচাপ দাঁড়িয়েছে অথচ আমাদের নেই কোনো হুঁশ। হেমন্তের শিশির আর কুয়াশা দিয়ে নয়, কবিতার জন্য থাকতে হয় বিস্তৃত আন্তরিকতা ও ভালোসাবার গভীর আহ্লাদ দিয়ে প্রশ্রয়ের প্লাবন। সেখানে নীলাভ নোনাফলের বুকে যে ঘন রস জমে তা যেন জমে কোনো এক গাঢ় আকাক্সক্ষার আবেশে। কবি ও কবিতা কখনো কখনো এমনই। সে চায় না, তাকে ঘিরে জমে উঠুক বেশি কথা ও কোলাহল। নিভৃতে আত্মগোপনে সে একা হতে চায়। কোনো কথা নয়, শুধুই ইন্দ্রিয়গুলো মেলে ধরো, প্রকৃতির হাজারও বাহানার দিকে। কবিতার মুখোমুখি বসে, চুপচাপ শুধু অনুভব করো। তবে এ চাওয়া যেন হয় শর্তহীন, আকারহীন।
0 Comments