আমি কোনোদিন প্রেমিক হতে পারিনি
আমি এক হতে গিয়ে একের ভেতর হয়েছি অসংখ্য
অথচ আমি এককভাবে শুধু প্রেমিক হতে চেয়েছি।
প্রেমিক হলে নিশ্চয় হত্যা করতে পারতাম না তনুকে
নিশ্চয় বিচার করতাম ত্বকী কিংবা সাগর-রুনি হত্যার
অমন দাউ দাউ আগুনে পুড়িয়ে মারতাম না নুসরাতকে
কিংবা আটকে দিতে পারতাম মুনিয়ার মৃত্যুও।
আমি প্রেমিক হতে গিয়ে হয়েছি ডাক্তার
আমার হাতেই বদলেছে মৃতের ময়নাতদন্ত—
আমিই হয়েছি সাংবাদিক অথবা পুলিশ অফিসার
আমার হাতেই ঘটনা ঘুরেছে ভিন্নখাতে—
হয়েছি ইঞ্জিনিয়ার,ভবন ধসিয়ে মেরেছি মানুষ
আমিই হয়েছি শিল্পপতি, হয়েছি খুব বড়ো আমলা
আমি প্রেমিক হতে গিয়ে হয়েছি উকিল
জজ,ব্যারিস্টার অথবা আর যা যা হওয়া যায়
তার সবই হয়েছি— শুধু প্রেমিকই হতে পারিনি।
কেননা, প্রেমিকেরা হয় অন্যরকম
তাদের বুকের ভেতর থাকে প্রেম,থাকে নিজস্ব শ্রম
হৃদয় খুঁড়ে তারা উত্তোলন করে মুঠোভরা মায়খনিজ প্রেমিকদের হতে হয় ভীষণ রকমের শ্রমিক।
আমি কোন দিন প্রেমিক হতে পারিনি
মোহ দিয়েছে বাধা,ক্ষমতা আটকে দিয়েছে পথ—
অথচ আজীবন আমি শুধু প্রেমিক-ই হতে চেয়েছি!
ক্যামোফ্লাজের শহর
রোয়া উঠা শহরের উন্নাসিক আলোয়
পরস্পরের সাথে আমাদের সম্পর্ক
আগুনের কাচিছাঁটা জামার মতো
একাকীত্ব তাই ইলেকট্রিক আগুন হয়ে
বহুদূর পর্যন্ত পোড়ায় সর্বস্ব দিয়ে।
বিলবোর্ড যুদ্ধ করে বিবেকের সাথে
আত্মা অবিশ্বাস করে আত্মীয়কে
কত শৈশবের ধুলো
পৌঢ়ত্বকে করে পরিহাস —
প্রতিটি প্রিয়জন
ভেতরে অন্যজন
প্রতিটি ঘরে আমাদের বিচ্ছিন্ন বাস
তবু আমরা পরস্পর বেঁচে থাকি
বিজ্ঞাপন জুড়ে।
এই শহরে রঙের চেয়ে প্রচার রঙিন
এই শহরে হৃদয়ের চেয়ে প্রদর্শন বড়ো—
এখানে আধুনিক হওয়া মানেই
নিজের মতো বাঁচা
দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তরে
কেবলই দৌড়ে দৌড়ে পৌঁছানো
সুতো দিয়ে সেলাই করা বিচ্ছিন্নতার গল্প।
এখানে মোড়কে মোড়কে বন্দি
আভিজাত্যের কান্না;
এখানে ঝিনুকের ব্যথা ঝুলে থাকে
ফুটপাতের দোকানে—
বিষাক্ত কার্বনের কাঁথা গায়ে জড়িয়ে
ভালোবাসা উদযাপিত হয়
ক্যামোফ্লাজের কারখানায়।
এই শহরের আয়না জুড়ে
আগুনের উৎপাত —
দৈনিক নিজের ভেতর থেকে
বেরিয়ে আসে দগ্ধ মুখ।
মৃত্যু থেকে মড়কের তফাত
আরও গভীরভাবে তাকাও
দেখতে পাচ্ছ দুঃসহ দিন?
দেখো,
কী অসাবধানে, কী অবিবেচনায়
আমরা দিনগুলো ঠেলে দিচ্ছি
অবজ্ঞায়
অবহেলায়
আমাদের ধাক্কায় হোঁচট খেতে খেতে
কিছুটা হামাগুড়ি দিয়ে
দিনগুলো চলছে মন্বন্তরের পথে।
অথচ ওই পথেই আমাদের শিশুরা হাঁটবে
ছুটবে বহুদূর...
আরও গভীরভাবে তাকাও
দেখো,
ঝাপসা করে দিয়ে নিকট
দূর কেমন চলে এসেছে কাছে!
আমরা ঠেলে দিচ্ছি দিনগুলো
আমরা তৈরি করছি এমন সময়
যেখানে হাঁটতে শেখার আগেই দৌড়াবে শিশু,
সময়কে ধরতে তারা ছুটবে মন্বন্তরের পথে।
একটু পিছনে তাকাও
কী দেখতে পাচ্ছ?
ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশু, তার চিৎকার, হামাগুড়ি
হাঁটতে শেখা এবং তার ছোটাছুটি?
কাকে দেখছো তুমি? কী দেখছো?
ভালো করে দেখো।
দেয়ালে দেয়ালে শৈশবের দাগ,
মায়ের বহুবর্ণ স্নেহের নিচে
নির্ভার পিতার পণ হাল ধরেছে জীবনের!
এবার সামান্য সামনে তাকাও,
অতীতের থেকে একটু দূরে,
কী দেখতে পাচ্ছ?
ঝলমলে ইতিহাসদিন
বেঁচে থাকার ইশতেহার নিয়ে কেমন হাসছে,
গুচ্ছ গুচ্ছ ফুলের মধ্যে দাঁড়িয়ে
আলাদা করছে মৃত্যু থেকে মড়কের তফাত!
আরও গভীরভাবে তাকাও,
দেখো,
কেমন ধেয়ে আসছে দুঃসহ দিন।
ঝরে যাওয়ার আগে
আমাদের শিশুদের জন্য
আমরা কি দিতে পারি না একটা নিরাপদ পৃথিবী?
কী অসাবধানে, কী অবিবেচনায়
আমরা দিনগুলো ঠেলে দিচ্ছি
অবজ্ঞায়
অবহেলায়
মড়কের দিকে
মন্বন্তরের পথে।
তারপরও ভালোবাসা থাকে
বিরহে ভিজে যাওয়ার পর
অনুতাপের জোনাকি জ্বলে -
স্মৃতির গলিঘুঁজিতে
দীর্ঘঃশ্বাসের ছায়া ফেলে;
যে দিন গেছে তা আবার ফিরে আসে
স্তব্ধতার রঙিন রাস্তায়—
কথা বলে সে মৌনভাষায়
যাপিত জীবনের দুয়ার খুলে খুলে।
ভিজছে হৃদয়
ফেলে আসা ভুলের সঙ্গে একা-একা—
পুরানো জোৎস্না কুয়াশার মত কথা কয়
অনেক স্বপ্ন ঢেকে দিয়ে ডেকে ডেকে হৃদয়ে।
আহা, অভিমান!
কীভাবে পুড়ো তুমি
প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ভিজেও!
কীভাবে উড়াও তুমি প্রেমের পদাবলি
উত্তুঙ্গ মেঘের শিখরে!
আমি হাত দিয়ে মেঘ ছুঁই,
মেঘ হাতড়ে খুঁজি তোমার মন
তবু তোমাকে পাই কতটুকু?
সব প্রেম হেরে গেলে
ঈর্ষা কথা কয়,
বুঝি তুমি কেঁপে ওঠো
প্রবল পরিতাপে।
তারপর ফের অনুভবের ফাটলে-ফাটলে
বিষণ্নতা জড়ায়
রাতের স্রোতের মতো নীরব হয়ে
বুকের গভীর দিগন্তে ছড়ায়।
কীভাবে তুমুল ভালোবাসতে হয়
তুমি ছাড়া আর কে আছে আমার দুঃখ দেয়ার!
আরেকবার তুমুলভাবে অমন করে একটু কাঁদাও
যাকে দিয়েছো বিস্তৃত বাগানের মতো কান্না
গোলাপকাঁটার মতো এত অল্প বেদনায় তার কি পোষে?
গল্পের আড্ডায় যে বন্ধুর চোখ পুড়ে ঈর্ষায়
নানা ছুতোয় খুঁচিয়ে দেয় যে হৃদয়
যে প্রতিবেশি ভালো আছি জেনে নাড়িয়ে দেয় দৈন্য
যে প্রতিযোগী হেরে গিয়ে হয় প্রতিক্রিয়াশীল
অবৈধ কৌশলে আক্রমন করে পেছন থেকে
জানো, তারা কেউ আমাকে কাঁদাতে পারে না!
বরং, তাদের উপর আমার রাগ হয় —
কখনো কখনো পায় প্রবল হাসি
তাদের কারো সামর্থ নেই আমাকে কাঁদানোর।
কেননা, তাদের কারো চোখে নেই আলাদাভাষা
তাদের রাগ,ক্ষোভ,সহমর্মীতা সবই একভাষায়
তাদের কারো নেই দৃষ্টি দিয়ে চশমা ভাঙার অদ্ভুত ক্ষমতা।
তারা কেউ শুধু চোখের দিকে তাকিয়ে একটা গোটা জীবন পড়তে পারেনি।
তারা কেউ জানে না আগুনের দ্বিতীয় ভাষা
তারা কেউ জানে না জলের দ্বিতীয় ব্যবহার।
তুমিই প্রথম চোখে চোখ রেখে কথা বলেছিলে আগুনের দ্বিতীয় ভাষায়
তুমিই প্রথম চোখ ফিরিয়ে শিখিয়ে ছিলে জলের দ্বিতীয় ব্যবহার।
তুমিই প্রথম ভালোবেসে শিখিয়ে ছিলে কীভাবে কাঁদতে হয়!
তুমিই প্রথম শিখিয়েছিলে কীভাবে তুমুল ভালোবাসতে হয়।

0 Comments