আর সব মানুষের সাথে আমার অনেক ধরণের পার্থক্য আছে। মেয়ে হিসেবে আমি চলনসই সুন্দরী। হাইটে, স্বাস্থ্যে, পোশাকেও আমি চলনসই। কিন্তু অন্যদের থেকে পার্থক্য আমার অন্য খানে। আমি ভীষণ রকম চটপটে, হাসিখুশি, শপিংপ্রিয়, বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, আড্ডাবাজ, রাগী, ঝগড়ুটে, অভিমানী এসব আমার নামের আগে পরে খুব যায়। আমার সবচেয়ে যেটা বেশি ভালবাসার জায়গা সেটা হলো মোবাইলে ফ্রে›ডদের সাথে প্রচুর আড্ডা মারা, চ্যাটিং করা। শুধু কলেজ, পড়া, খাওয়া আর ঘুম ছাড়া আমি সারাক্ষণ প্রায় ফোন নিয়েই পড়ে থাকি। আমার বিশাল ফ্রে›ড লিস্টের অনেকেই এজন্য আমার ওপর ক্ষেপা। এ নিয়ে প্রায়শই আমাকে কম ঝামেলাও পোহাতে হয়নি। অসংখ্য ভার্চুয়াল প্রেমিক তৈরি হওয়াসহ এ পর্যন্ত প্রায় কুড়িবার আমার আইডি হ্যাক করা হয়েছে। এমনকি আমার পার্সোনাল ফোন নাম্বারও পাবলিক করা হয়েছে। এগুলো নিয়ে একাধিকবার বিব্রতকর অবস্থায় পড়লেও আমি আমার নিজের অবস্থান থেকে এক বিন্দুও সরে আসিনি।
আম্মু বলতেন, এসব কি করছিস পিউ? এগুলো ঠিক না। সরে আয়।
আমি সরে আসিনি।
আব্বু বিদেশ থেকে বলতেন, এগুলো করো না মা। বড় হচ্ছো। এগুলো থেকে সরে এসো।
আমি সরে আসিনি।
নুসু বলতো, মিম বলতো, সব বন্ধু বান্ধব বলতো, সরে আয়,সরে আয় এসব থেকে।
আমি একটুও সরে আসিনি। আমি থেকেছি আমার মতো, আমি চলেছি আমার মতো। আমার অবস্থান থেকে আমি একটুও চলে আসিনি, একটুও সরে আসিনি।
তবে আদিত্যর সাথে সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পর একটু একটু করে পরির্তন লক্ষ্য করেছিলাম আমার নিজের মধ্যে। ওর সান্নিধ্য আমার মধ্যে পরিবর্তন আনছে এটা ভেতরে ভেতরে টেরও পেতাম আমি। কিনÍু কি করে যেন নিজেকে আর আগের অবস্থানে নিয়ে যেতে পারতাম না। আমার ডানপিটেমি, আমার উচ্ছ্বলতা, আমার রাগ, আমার অভিমান এসবের মধ্যে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করতাম। আমি নিজেই পরিবর্তন হয়েছি, নাকি আদিত্য আমাকে পরিবর্তন করে দিয়েছে এটা ঠিক বুঝতাম না আমি। আবার বুঝতামও।
ফেসবুকের মাধ্যমেই আদিত্যর সাথে প্রথম যোগাযোগ আমার। তখন কেবল কলেজ, পড়া আর খাওয়া দাওয়া এই সময়ের বাইরে পুরোটা সময় কাটতো আমার ফেসবুকে। বাবা মা’র একমাত্র মেয়ে আমি। বাবা থাকেন দেশের বাইরে। মা গ্রামে একা। আর আমি হোস্টেলে। বলতে গেলে একটা পরিবারের তিনজন মাত্র মানুষ আমরা। নিষ্ঠুর সময়ের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আমরা তিনজন তিন জায়গায়। তিনজনই ভীষণ একা, অসহায়, নিঃসঙ্গ। আমার একাকিত্ব ঘোচানোর উপযুক্ত মাধ্যম ছিলো ফেসবুক। বলতে গেলে দিনে দিনে আমি ফেসবুকে এতোটাই আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, এমন যদি হতো, এক সপ্তাহ আমার ফোন আমার কাছে না থাকে। আমি বোধহয় স্ট্রোক করে মারা যাবো। দিন রাত ছবি পোস্ট, লেখা, কমেন্টস, কমেন্টস-এর উত্তর, বিভিন্ন রকম মজার ও বিরক্তিকর বিষয় সামলানো। এসব নিয়েই থাকতাম। ভালো মন্দ দুটোই চলছিলো তখন আমার। হঠাৎ একদিন আমার ফ্রেন্ড লিস্টে যুক্ত হয়ে যায় আদিত্য। তখন ওকে আমি ভালোমতো চিনতাম না, জানতাম না। জানতাম না এই বোকাসোকা সরল মানুষটাই একসময় আমার সুখ দুঃখের বড় কারণ হবে।
প্রথম প্রথম ফেসবুকে আদিত্যকে আমি তেমন লক্ষ্য করিনি। তবে মাঝে মধ্যে আমার স্ট্যাটাসে ও সুন্দর সুন্দর কমেন্টস করতো। কোন লেখা তার ভালো লাগলে আমাকে উৎসাহ দিতো। আমিও ভদ্রতাবসতো তার কমেন্টস-এর প্রতিউত্তর দিতাম। এরপর আদিত্য ইনবক্সে নক দিতে শুরু করে হঠাৎ হঠাৎ। খুবই সংক্ষিপ্ত, টুকটাক কথা হতে থাকে আমাদের মধ্যে । এরকম ভাবেই চলে কিছুদিন। এরমধ্যে আমি আদিত্যর প্রোফাইলে ঢুকে জেনে ফেলি সে শিল্প, সাহিত্যের চর্চা করে। কয়েকটা সংগঠনের সাথে যুক্তও সে। বিবাহিত। দুটো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালায়। ফেসবুকে ওর স্ট্যাটাস দেখে ওকে আমার ব্যাস্ত মানুষই মনে হয়। ওর কিছু কিছু স্ট্যাটাসে আমিও কমেন্টস করি। আদিত্য রিপ্লাই দেয়। একদিন ঝড়ে টিন উড়ে যাওয়া এক দরিদ্র পরিবারের জন্য আদিত্যর কাছে কিছু আর্থিক সহযোগীতা চাই আমি। আদিত্য সামান্যই সহযোগীতা করে। সেই সুবাদে আমার ফোন নাম্বার পেয়ে যায় সে। এরপর বিকেলে মাঝে মধ্যে আমাকে স্বল্প সময়ের জন্য ফোনও করতে থাকে। কুশল জিজ্ঞাসা করতে থাকে। আমিও স্বল্প কথায় উত্তর দিই।
ইনবক্সের কল্যাণে দিনে দিনে আমাদের সম্পর্কটা একটা ভদ্রচিত সুসম্পর্কে রুপ নেয়। আদিত্যই আমাকে ইনবক্সে নক করতে থাকে দিনে দুএকবার। আমি কেবল রিপ্লাই দিতে থাকি। একদিন হঠাৎ দুপুরে ইনবক্সে আমাকে নক দেয় আদিত্য। আমি তখন ট্রেনে। বলি, ট্রেনে আছি। বগুড়া যাচ্ছি। আদিত্য বলে, এসময় তো তোমার কলেজে থাকার কথা। বলি, আপার বাসায় এসেছিলাম রাজশাহীতে। বেড়াতে। বেড়ানো শেষ এখন বগুড়া যাচ্ছি। সেদিনই প্রথম দীর্ঘ সময় ধরে ইনবক্স্রে কথা বলি আমরা। মজা করি, হাসাহাসি করি। কথায় কথায় বলে ফেলি, এ মাসের ২৬ তারিখে আমার বার্থ ডে।
মাঝে প্রায় ১০ দিন চলে যায়। এরমধ্যে ইনবক্সে টুকটাক কথা হয় আমাদের। একদিন রাতে হঠাৎ আদিত্য নক দেয় আমাকে, পিউ কি করো?
আমি রিপ্লাই দিই, বাসায় এসেছি।
‘বাসায় কেন? কাল তোমার বার্থ ডে। তুমি বগুড়ায় থাকবা না?’
আমি হেসে ফেলি, আপনি আমার বার্থ ডের তারিখ মনে রেখেছেন?
‘প্রমাণই তো পেলে মনে রেখেছি, না ভুলে গেছি।’
‘ধন্যবাদ। আসলে আম্মু জোরাজুরি করলো। এবারের বার্থ ডে টা আমি বাসার সবার সাথে কাটাতে চাই। গতবছর শহরে বার্থ ডে করেছি। আম্মু খুব মন খারাপ করেছেন।’
আদিত্য মন খারাপ করে বলে, ইশ! কাল বগুড়া থাকলে তোমাকে উইশ করতে পারতাম!’
‘তাই?’
‘হুম।’
পরদিন সকাল দশটায় ফোন করে আমাকে উইশ করে আদিত্য। বলি, বগুড়া আসছি। বিকেলে ইকো পার্কে আসেন। আমার ফ্রেন্ডরাও থাকবে। আমার কথায় আদিত্য অসম্ভব খুশি হয়। আমার জন্য কেক নিয়ে আসার পারমিশন চায়। আমি ইতস্তত করি। তবে শেষ পর্যন্ত না করতে পারি না। এই উপলক্ষ্যে ওর সাথে আমার দেখা হবে। বিষয়টা খারাপ না।
আমি পৌঁছার তিন ঘন্টা আগেই আদিত্য তার ফ্রেন্ডকে নিয়ে ইকো পার্কে হাজির হয়। আমাকে নক দেয়। বলি, আমার আসতে কিছুটা দেরি হবে। ওখানে আমার ফ্রেন্ডরা আছে। তুমি ওদের সাথে যোগ দাও।
আদিত্য আমার জন্য অনেক অপেক্ষা করে। অবশেষে ফিরেই প্রথমে আদিত্যর সাথে দেখা করি আমি। প্রথম দেখা। লজ্জা দুজনকেই পেয়ে বসে । আমাদের দুজনকেই আড়ষ্ট দেখায়। কেউ স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতে পারি না। সামান্য কুশল বিনিময় হয়। আমার দেরি হওয়ার জন্য সরি বলি। এটুকুই। আদিত্য হাসিমুখে মেনে নেয়। শেষে বলি, ছোট্ট আয়োজন। অনেক দেরি হবে। এখনও সাজানো হয়নি। সন্ধ্যা পেরিয়ে যাবে। আপনি কি ততক্ষণ থাকবেন? আদিত্য ছোট্ট করে উত্তর দেয়, হ্যাঁ থাকবো।
শীত শীত সন্ধ্যা। ফ্রেন্ডরা এটা ওটা সাজাতে গিয়ে আরো দেরি করে ফেলে। অনেক কাঠখড়ি পোড়ানোর পর লাইট জ্বলে। মিউজিকের ব্যাবস্থা হয়। মজার ব্যাপার, প্রায় চার ঘন্টা ধরে আদিত্য ওর ফ্রেন্ডকে নিয়ে আমাদের কাছাকাছি ঘুরঘুর করে সময় কাটায়। একটিবারের জন্যও আমাদের কেক কাটার জন্য তাড়া দেয় না। সব কাজ শেষে আদিত্যর আনা কেকটা সামনে এনে সাজানো হয়। সবকিছু রেডি করা হয়। এখন কেক কাটার পালা। আদিত্যরা একটু দূরে আবস্থান করছিলো। ওকে ডেকে আনা হয়। মঞ্চ থেকে একটু দূরে এসে অবস্থান করে আদিত্য। লজ্জায় মাথা নিচু করে থাকে। আমি ধমক দেয়ায় মঞ্চে উঠে আমার পাশে এসে দাঁড়ায় লাজুক আদিত্য। এরপর হাততালি, কেক কাটা, ছবি তোলা এসবের পর আমাকে একটা ছোট্ট গিফট দিয়ে দ্রুতই বিদায় নেয় আদিত্যরা। আমি আমার ফ্রেন্ডদের নিয়ে আনন্দে মেতে থাকি।
প্রোগ্রাম থেকে ফিরে রাতে নক দিই আদিত্যকে। তাকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করানোর জন্য দুঃখ প্রকাশ করি। ভেবেছিলাম, তাকে অপেক্ষা করানোয় হয়তো মন খারাপ করবে আদিত্য। কিন্তু না, আদিত্য মোটেও মন খারাপ করে না। উল্টো আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে, আরে না, অপেক্ষার সময়টা আমার ভালোই কেটেছে। অনেক কিছু দেখে সময় পার করেছি। আদিত্যর কথাটা আমার ভালো লাগে।
তিন দিন পর। নক দিই আদিত্যকে। বলি, আমার এক আত্মীয়র জন্য এক ব্যাগ রক্ত লাগবে। এ পজিটিভ। দ্রুত ব্যাবস্থা করো। আদিত্য তখন কি একটা প্রোগ্রামে। বলে, টেনশনের কোন কারণ নেই। আমার রক্তের গ্রুপ এ পজিটিভ। কখন আসবো?
আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। বলি, সন্ধ্যায় এসো। .
সময়ের আগেই দ্রুত চলে আসে আদিত্য। আমি তখন ফ্রেন্ডের সাথে হসপিটালের সামনে বসে পেয়ারা মাখা খাচ্ছিলাম। আদিত্য এসে হাসিমুখে আমাদের সাথে যোগ দেয়। এরপর আমরা তিনজন বসে চা খাই। আমাদের চায়ের বিলটাও আদিত্য দিতে দেয় না।
এরপর ল্যাবে যাই আমরা। কয়েকটা ফর্মালিটিজ সারতে অনেক দেরি হয়। আদিত্য মোটেও বিরক্ত হয় না। এরপর ব্লাড দিয়ে চলে যায় আদিত্য। আধা ঘন্টা পর ল্যাবে ডেকে পাঠানো হয় আমাকে। জানানো হয় আপনার ডোনারের ব্লাড আমরা পেশেন্টকে দিতে পারবো না ম্যাডাম। আমি আর্শ্চয হয়ে বলি, কেন? সমস্যা কি?
টেকনোলজিস্ট জানায়, ম্যাডাম উনার ভিডিআরএল রিপোর্ট রিএ্যাকটিভ এসেছে। মানে উনার সম্ভবত যৌনরোগ আছে। কথাটা শুনে আমি প্রায় হতভম্ব হয়ে পড়ি। মুহূর্তেই আমার দুকান দিয়ে যেন ধোঁয়া বেরিয়ে যায়। ল্যাব থেকে দ্রুত বেরিয়ে আমি আদিত্যকে ফোন দিই। নিজেকে যথাসম্ভব সংযত রেখে বলি, তোমার ব্লাড নিয়ে একটা প্রোবলেম হয়ে গেছে। তোমার ব্লাড রোগীকে দেয়া যাচ্ছে না।
আদিত্য আশ্চর্য হয়ে বলে, কেন?
‘তোমার ব্লাডে ভিডিআরএল রিএকটিভ এসেছে।’
আমার কথায় আদিত্য যার পর নেই বিস্মিত হয়ে বলে, হোয়াট! অসম্ভব। আমি এর আগেও ষোল বার ব্লাড দিয়েছি। প্রতিবারই স্ক্রিণিং টেস্ট করানো হয়েছে। কোনদিন খারাপ রিপোর্ট আসেনি। এই রিপোর্ট ভুল। আমার স্ত্রী আছে। আমি জীবনেও কোন বাজে নারীর কাছে যাইনি। আমি জানি আমার কোন প্রবলেমই নেই। আমি ওই রিপোর্টকে চ্যালেঞ্জ করবো। আজই আমি অন্য জায়গায় ব্লাড টেস্ট করাবো।
আমি বলি, আমারও কথাটা বিশ্বাস হয় না আদিত্য। আমারও মন খারাপ হয়েছে অনেক।’
‘তুমি আমার ওপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখো।’
আদিত্য জেদি ছেলে। সে নিজের ওপর, নিজের কাজের ওপর অনেক আস্থা রাখে। কিছুক্ষণ পরেই সে আরেকটা ল্যাবে ব্লাড টেস্ট করিয়ে রিপোর্ট আমাকে ইনবক্স করে। রিপোর্টে দেখা যায় আদিত্যর ভিডিআরএল রিপোর্ট নন-রিঅ্যাকটিভ। আমার বুক থেকে পাথর নেমে যায়। কিন্তু পরদিন আর ওই ব্লাড রোগীকে দেয়া হয় না । আদিত্য খুবই মন খারাপ করে। আদিত্য টেকনোলজিস্টের ফোন নাম্বার চায়। কিন্তু হসপিটাল থেকে নাম্বার দিতে সম্মত হয় না । এরপর সম্ভবত মনে মনে ওই টেকনোলজিস্টের ওপর ক্ষেদোক্তি করে আদিত্য নিজের রাগ কমায়।
আদিত্যর সাথে সখ্যতা আমার একটু করে বাড়তে থাকে। দুদিন পর বিকেলে আমার কয়েকজন ফ্রেন্ডকে নিয়ে ইকো পার্কে বেড়াতে যাই। আদিত্য নক করে আমাকে। বলি, পার্কে আছি আসেন। ব্যাস্ততায় আদিত্য আসতে পারে না। আদিত্য তার এই ব্যাস্ততার জন্য সরি বলে।
কয়েকদিন পর বাসায় যাই আমি। আসার দিনে আদিত্য নক দেয়। বলি, তোমার জন্য পিঠা আর আচার বানিয়ে নিয়ে আসছি। আদিত্য যারপর নাই খুশি হয়। সেদিন সন্ধ্যায় আদিত্য আসে আমার হোস্টেলের সামনে। সেদিনই প্রথম একসাথে রিকশায় পাশাপাশি বসি আমরা। শীতের সন্ধ্যা। শহরের আলো আঁধারি রাস্তা বেয়ে ধীর গতিতে চলে আমাদের রিকশাটা। আমার ভালো লাগে। সম্ভবত আদিত্যরও ভালো লাগে। আড়ষ্ট কন্ঠে আমরা টুকটাক কথা বলি। আবার কিছুক্ষণ থেমে থাকি দুজনেই। হঠাৎ একসময় আদিত্য আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে, পিউ তোমার একটা হাত ধরি? আমি আচমকা লজ্জা পেয়ে যাই। বলি, না।
আদিত্য কোন জোরাজুরি করে না। কোন মন খারাপ করে না। আমরা ফাস্ট ফুডের দোকানে গিয়ে পাশাপাশি বসি। আদিত্য ফ্রাইড রাইস, চিকেন, সালাদ আর কোকের অর্ডার দেয়। আমরা একসাথ ডিনার সারি। অনেকক্ষণ ধরে গল্প করি। ফেরার সময় আদিত্য আমাকে ছোট্ট একটা গিফট দেয়। রুমে এসে দেখি একটা ম্যাড কালারের দামি বিদেশি লিপস্টিক। আমার ভীষণ ভালো লাগে। রাতে ইনবক্সে ধন্যবাদ দেই আদিত্যকে।
দুদিন পর। আদিত্যকে নক দেই, তোমার মোটর সাইকেল নেই?
আদিত্য বলে, আছে একটা। তবে লং ড্রাইভের জন্য উপযুক্ত নয়। কিছু যান্ত্রিক সমস্যা আছে। তবে নষ্ট নয়। চলে।’
‘তুমি চালাতে পারো তো?’
‘হ্যাঁ পারি। তবে জোরে চালাই না। এজন্য আমার কোন এক্সিডেন্ট নেই।’
পরদিন সন্ধ্যায় আদিত্য মোটর সাইকেল নিয়ে এসে হাজির। আমি নিঃসঙ্কোচে আদিত্যর মোটর সাইকেলে উঠি। আদিত্য মাঝারি গতিতে চালাতে থাকে। আমি বলি, জোরে চালাও। আদিত্য বলে, বেশি জোরে চালানো যাবে না। আমি আদিত্যর ওপর বিরক্ত হয়ে বলি, তুমি দেখি গরুর গাড়ির মতো চালাও। আমার বাবার মতো। সেদিন আদিত্য আমার বিরক্তির বিষয়টা বুঝে ফেলে। আমাকে কিছু বুঝতে দেয় না। সেদিন আমরা ফ্রেঞ্জ ফ্রাই আর আমার প্রিয় ক্যাপেচিনো খেয়ে রুমে ফিরি।
পরের সপ্তাহে আদিত্য একটা নতুন মোটর সাইকেল নিয়ে আসে। বলি, নতুন মোটর সাইকেল কিনলে নাকি? আদিত্য হেসে বলে, না। অনেক টাকা খরচ করে মোটর সাইকেলটা নতুনের মতো করে ফেলেছি। তুমি আগেরটা পছন্দ করোনি, তাই। আমি হেসে ফেলি। একদিন বললাম, তোমার ফোনটা সেকেলে। আদিত্য কদিন পরই একটা নতুন ফোন নিয়ে আমার সামনে হাজির। বলে, আগেরটা তুমি পছন্দ করতে না। তাই নতুন কিনলাম। আমি হেসে ফেলি।
এরকমই চলছিলো আমাদের। এরকম ভাবেই চলছিলো। ভীষণ রকম ভালো। আদিত্য বলে, তোমার যতোরকম সমস্যা, যা কিছু প্রয়োজন, প্রথমে আমাকে বলবা। আদিত্যর কথাটা আমার অনেক ভালো লাগে। এরকমভাবে কেউ কখনো বলে না আমাকে। বলেনি কোন দিন। এরপর আমার কোন কিছুর প্রয়োজন হলেই আদিত্যকে নক দিই। আদিত্য তড়িৎ বেগে আমার প্রয়োজনের জিনিস আমাকে ব্যবস্থা করে দেয়। মোবাইলে সীম লাগবে, সীম কিনে দেয়। ফ্লেক্সি লাগবে, ফ্লেক্সি দিয়ে দেয়। কিছু কাগজপত্র সত্যায়িত করতে হবে, ব্যাবস্থা করো। আদিত্য ব্যাবস্থা করে।
কখনও কখনও রাগ করতাম আদিত্যর ওপর, অভিমান করতাম। আদিত্য একদিনেই আমার রাগ, অভিমান ভেঙ্গে দিতো। একবার মন খারাপ করে বাসায় যাই। আদিত্য জানে না আমি বাসায় গেছি। বিকেলে নক দেয় আদিত্য, কই তুমি?
আমি রিপ্লাই দেই, বাসায়।
আদিত্য হতাশ হয়ে বলে, ওফ্! তোমার জন্য পেয়ারা কিনে রেখেছি।
তখন আমার কি আর রাগ থাকে? বলি, তাই নাকি? আমি দুদিন পরে আসছি। গিয়ে নেবোনি।
‘তখন তো থাকবো না আমি।’
‘থাকবে না মানে কি? কোথায় যাবে?’
‘ঢাকায় যাবো। প্রোগ্রাম আছে। আচ্ছা পেয়ারাগুলো ফ্রিজে রেখে দিলাম। ফিরে এসে তোমাকে দেবোনি।’
‘ওকে। ঢাকা থেকে আমার জন্য চুড়ি নিয়ে আসবা কিন্তু।’
‘ওকে আনবো। কিসের চুড়ি?’
‘কাঁচের।’
‘ওকে।’
‘সত্যি?”
‘আমি কি কখনও মিথ্যে কথা বলেছি?’
রাতের বাসে ঢাকায় যায় আদিত্য। আমি হোস্টেলে আসি সকালে। বিকেলে নক করি আদিত্যকে, আমার চুড়ি কই?
আদিত্য রিপ্লাই দেয়, কিনেছি। চার কালারের চার ডজন।
পরদিন মোটামুটি বৃষ্টি হয়। শীতের দিন আরও শীত বাড়ে। বিকেলে নক দেয় আদিত্য, পিউ রেডি থেকো। আসবো। আমি ইনবক্সে লিপস্টিকের পিক দেই। আদিত্য হাসে।
একটু পর বৃষ্টির তীব্রতা কমে আসে। ভেবেছিলাম এই তীব্র শীতে আজ হয়তো আদিত্য আসবে না। কিন্তু একটু পর আমাকে অবাক করে দেয় আদিত্য, বাইরে এসো। এসেছি আমি। আমি দ্রুত বাইরে আসি। শীতের কারণে সেদিন বাইরে যাবার জন্য পিড়াপিড়ি করে না আদিত্য। একটা কফি শপে কফি খেয়ে একটা ব্যাাগ আমাকে ধরিয়ে দেয়। রুমে এসে দেখি চারটা ভিন্ন ভিন্ন কালারের লিপস্টিক, চার ডজন কাঁচের সুন্দর চুড়ি, পেয়ারা। আমি মনে মনে আদিত্যকে অনেক ধন্যবাদ দেই।
পরদিন রাতে নক দেয় আদিত্য, মম-ইন থিয়েটাকে কাঠবিড়ালী মুভি দেখতে চাই তোমার সাথে। আমি রাজি হই। নির্দিষ্ট দিনে সকালে নক দেয় আদিত্য, বিকেল তিনটায় শো। আমি পৌণে তিনটায় যাবো।
আমি রিপ্লাই দিই, আড়াইটা পর্যন্ত আমার ক্লাস। এরপর রুমে গিয়ে রান্না, গোসল, খাওয়া। দ্যান মুভি।
আদিত্য বলে, এতো কিছুতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। ক্লাস শেষে ক্যান্টিনে খাবা আজ। আর আজ তোমার গোসল বন্ধ।
আমি হেসে উত্তর দেই, আচ্ছা।
রেডি হওয়ার আগে আদিত্য নক দেয়, রেডি হচ্ছি। তুমিও রেডি হও।
আমি রিপ্লাই দেই, ওই মুভি নাকি ভালো না।
আদিত্য অবাক হয়, আচ্ছা ভালো না হলেও দেখবো।
‘ভালো হলে যেতাম।’
আদিত্য রাগ করে, মুভি না দেখেই বললে ভালো না?’
‘আমার এক ফ্রেন্ড দেখেছে। বলেছে ভালো না।’
‘ওকে তোমাকে যেতে হবে না।’
ভেবেছিলাম আমি মুভি দেখতে গেলাম না, আদিত্যও হয়তো যাবে না। কিন্তু মুভি দেখার পর আমাকে নক দেয় আদিত্য, মুভি দেখলাম। আমি এখনও মম-ইনে। এসো একসাথে কফি খাবো।
আমার রাগ বেড়ে যায়। আমি রিপ্লাই দিই না। আমাকে ফোন করে আদিত্য। আমি ফোন ধরি না।
আদিত্যকে আমি নিজে থেকে নক করি না এখন। আগে করতাম। এখন আমাকে নক করতে হয় না। তার আগে নিজেই নক করে আদিত্য। ফোন করে। যেন এখন আমাকে নক করার, ফোন করার দায়িত্বটা ও একাই নিয়েছে। কোন কোন দিন নক করে না আদিত্য। ফোন করে না। রাগ করে থাকে। মন খারাপ করে থাকে। হয়তো ভাবে, আমি পিউকে এতোবার নক করি, ফোন করি। পিউ আমাকে একবারের জন্যও নক করে না। দেখিতো আজ পিউ আমাকে নক করে কি না! কিন্তু না।্ আমি আদিত্যকে নক করি না। ইচ্ছে করেই করি না। ফেসবুকে আমার অসংখ্য ফ্রেন্ড। তাদের সাথে দিনমান চ্যাটিং করার পর আদিত্যকে আর নক করতে ইচ্ছ করে না। আদিত্যর রাগ আর অভিমান নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথাও নেই। কারণ এরই মধ্যে জেনে ফেলেছি, আমার ওপর রাগ বা অভিমান করে আদিত্য একদিনের বেশি থাকতে পারবে না। হয়ও তাই। পরদিন সকাল বা দুপুরেই আদিত্য আমাকে উইশ করে, গুড মণিং পিউ, গুড নুন পিউ। আদিত্যর এই উইশ-এর ব্যাপরাটা আমারও ভালো লাগে। আমিও রিপ্লাই দেই। রাগ করে থাকি না।
আদিত্যর সাথে আমার প্রায়ই দেখা হয় না। সপ্তাহে দুদিন দেখা হওয়ার ডেট আমাদের। কিন্তু কখনও কম হয়, কখনও বেশি হয়। যখন ওর ব্যাস্ততা থাকে কিংবা আমার, আমাদের ডেট মিস হয়ে যায়। একটু মন খারাপ হলেও এ বিষয়টা আমরা সহজ ভাবেই নিই। পরে কোন ডেট করে দেখা করি।
আদিত্য খুবই টাইম মেনটেইন করে। আমার জীবনে এরকম ছেলে আমি প্রথম দেখেছি। ওর যে সময়ে আসার কথা ঠিক সে সময়েই আসে। কখনও দুএকমিনিট আগেও আসে কিন্তু দুমিনিট পরে নয়। আমিই হয়তো দুমিনিটের কথা বলে পাঁচ দশ মিনিট পরে আসি। কারণ আমি ওর মতো টাইম মেনটেইন করতে পারি না। আমার দেরির কারণে আদিত্য আমাকে কখনও অভিযোগ করে না। মন খারাপ করে না। বরং বেশি দেরি হওয়ার কথা বললে আদিত্য বলে, তুমি তোমার মতোই আসো। অতো তাড়াহুড়ো নেই। আমি অপেক্ষা করছি। আদিত্যর আরও একটা বিষয় আমার কাছে খুব ভালো লাগে, তাহলো আদিত্য কখনও মিথ্যে কথা বলে না। ওর সংসার, বাচ্চা, ব্যবসা, উপার্জন সব বিষয়ে সত্যি কথা বলে। এটাও একটা অনেক ভালো লাগার বিষয় আমার কাছে। এখনকার ছেলে মেয়েরা পরস্পরকে কাছে পাবার জন্য কতো ধরণের মিথ্যে কথা বলে। কতো ধরণের প্রতারণা করে! অথচ এগুলোর কিছুই উপস্থিত নেই আদিত্যর মধ্যে। ওকে যখন ডাকি তখনই সাঁড়া দেয় আমার ডাকে। বাসায় যাবো, মটর সাইকেলে লিফট দাও। আদিত্য দিচ্ছে। বাসা থেকে হোস্টেলে যাবো। আদিত্য লিফট দিচ্ছে । ভাড়া নেই ধার দাও। আদিত্য দিচ্ছে। হাতে টাকা নেই নাস্তা খাইনি। আদিত্য দ্রুত এসে নাস্তা খাইয়ে দিচ্ছে। কিছু খাবার বা গিফট দিচ্ছে। আমার পছন্দের কোন শাড়ি বা অন্যকিছু কিনে দিচ্ছে। ও কেমন সহজ, সরল, বোকা বোকা!
উপদেশ দেয়ায় আদিত্যর জুড়ি মেলা ভার। আদিত্য আমাকে প্রায়ই উপদেশ দেয়, সত্য কথা বলবা। মিথ্যাকে ঘৃণা করবা। মানুষকে কষ্ট দিবা না। মানুষের উপকার করবা নিঃস্বার্থ ভাবে। প্রতিদানের আশা করবা না। তাহলে নিজেই কষ্ট পাবা। বাজে ছেলেদের সাথে আড্ডা দিবা না। ফেসবুকে বেশি পিক দিবা না। দুষ্টদের ব্লক করবা। পড়াশোনা ভালো করে করবা । নিজের ক্যারিয়ারের একটা গোল সেট করে সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাবা। আর হ্যাঁ, তোমার বাবা অনেক কষ্ট করে বিদেশ থেকে টাকা পাঠায় তোমাকে। অযথা টাকা খরচ করবা না। টাকা কম খরচ করবা। ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে আদিত্য সব উপদেশ এক দিনে দেয় না। প্রতিদিন একটা দুটো করে দেয়।
আদিত্যর সাথে আমার বয়সের পার্থক্য অনেক বেশি। শিক্ষা, মানসিকতা, অভিজ্ঞতার পার্থক্যও বেশি। তারপরও আদিত্যর মধ্যে কোন অহংবোধ নেই। সে নিজেকে সবসময় অতিতুচ্ছ, অতিসামান্য কিছু মনে করে। ওর মধ্যে বিনয়, অন্যকে সম্মান দেয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। সকল ধরণের মানুষকে আপন করে নেয়ার ক্ষমতাও বেশি । সব সময় কেমন হাবাগোবা মার্কা হাসিখুশি। এই ধরণের মানুষেরা ঠকে অনেক বেশি। প্রতারিত হয় বেশি। এ বিষয়ে অনেক কষ্টকর আক্ষেপও আছে আদিত্যর মনে। কিন্তু এটা নিয়ে নিজের মধ্যে অতোটা অনুশোচনা সে পুশে রাখে না। আদিত্য বলে, আমার ভুলের জন্য কোন অনুশোচনা নয়, আমি প্রায়শ্চিত্ত করতে রাজি। কারণ আমি যা করি, বুঝে শুনে ঠান্ডা মাথায় করি। আদিত্য কেমন আলাদা মানুষ। একদম ব্যতিক্রম।
এভাবেই, এরকম ভাবেই টক ঝাল মিষ্টির মতো আমাদের সুসম্পর্কটা এগিয়ে যাচ্ছিলো ক্রমশঃ। মাস তিনেক চলে এরকম। শেষের দিকে আদিত্যর প্রতি আগ্রহ কেন যেন কমে আসে আমার। ও আমাকে বেড়াতে নিয়ে যেতে চাইলে না করি। আমার সাথে চা খেতে চাইলে না করি। গল্প করতে চাইলে না করি । আমাকে কিছু কিনে দিতে চাইলে না করি। ফোন করলে কেটে দেই। ইনবক্সে নক করলে রিপ্লাই দিই না। জানি, আমার হঠাৎ এরকম আচরণে ভেতরে ভেতরে আনেক কষ্ট পাচ্ছে আদিত্য। তারপরও ওর সাথে কথা বলতে আমার কেন যেন ভালো লাগে না। শেষ দিনে আদিত্যর একটা বাক্য দেখলাম আমার ইনবক্সে, আসলে তুমি আমাকে ভালোই বাসো না।
আমি রিপ্লাই দেই না। ক্ছিুক্ষণ পর আদিত্য ফেসবুক আইডি ডিজেবল দেখি। ভাবি আদিত্য এবার একটু বেশি রাগ করেছে। এ রাগ ভাঙতে হয়তো একটু বেশি সময় লাগবে। লাগুক। রাগ মরে গেলে আদিত্য আমাকে ঠিকই নক করবে। আমার জন্য পেয়ারা, আপেল, বরই নিয়ে এসে ফোন দিয়ে বলবে, ওই ছুঁড়িডা, বের হও আমি এসেছি।
তিন চার দিন নানা ব্যাস্ততায় কাটে আমার। কি কি করতে যেন সময়টা চলে যায় হুট করে। আদিত্যর ইনবক্সে ঢুঁ দেয়ার সময় পাই না। পঞ্চম দিনে ভোরে হঠাৎ বেশি মনে পড়ে আদিত্যর কথা। আমার ইনবক্স চেক করে দেখি আদিত্যর কোন ম্যাসেজ নেই। এরকম হওয়ার কথা না। একদিন বড়জোর দুদিন পরেই আমাকে নক করার কথা আদিত্যর। করেনি। ফোনও করেনি। আদিত্যর আইডি দেখলাম, ডিজেবল। আমার একটু মন খারাপ হয়, আদিত্যর এ ধরণের স্বভাব ওর সঙ্গে যায় না। ভাবি, আরও দুদিন যাক, দেখি।
দুদিন কাটে বটে কিন্তু এই দুদিন আদিত্যকে একটু একটু করে মিস করতে থাকি। ওর জন্য একটু একটু করে কষ্ট বাড়তে থাকে আমার মনের মধ্যে। আমার আইডি, আমার ইনবক্স চেক করি কিছুক্ষণ পরপর। না কোন খবর নেই আদিত্যর। আমাকে না বলে অভিমান করে কোথাও গেলো না তো আদিত্য! না বিশ্বাস হয় না। যতই রাগ বা অভিমান থাক কোথাও যাবার আগে অবশ্যই আদিত্য আমাকে নক করবে, ওমুক জায়গায় যাচ্ছি। তোমার জন্য কি নিয়ে আসবো?
আদিত্যর সাথে যোগাযোগের ইচ্ছে বেড়ে যায় আমার। বেশি কিছু না ভেবে ফোন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ভাবি, ফোন রিসিভ করলেই প্রথমে আগে ইচ্ছেমতো বকা দেবো ওকে পাঁচ মিনিট ধরে। কুকুর, বিড়াল, সাপ, বানর, জানোয়ার এসব বলবো। ওকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে প্রথমেই কৈফিয়ত চাইবো। কি কারণে আমাকে এতোটা কষ্ট দিলে তুমি? জানো আমি অভিমান করে আছি, তবু আমার অভিমান ভাঙ্গালে না কেন? যাও তোমার মতো নিষ্ঠুর ছেলেদের সাথে আর কথা বলবো না। এরকম বলে ফের ফোন কেটে দেবো। এরপর আমার কৃত্রিম রাগ দেখে আমাকে আবার ফোন দিতে শুরু করবে আদিত্য। সরি টরি বলে, কান ধরে ফের আমাকে নিয়ে চা খাওয়াতে নিয়ে যাবে। বেড়াতে নিয়ে যাবে।
আমি আদিত্যর নাম্বারে ফোন দিয়ে প্রথমে হতাশ হই। দ্বিতীয়বারের চেষ্টাও বিফলে যায়। ওর ওপর আমার সমস্ত রাগ আর অভিমান এক মুহূর্তে হতাশায় পরিনত হয়। পাশাপাশি মনের মধ্যে জিদও চাপে যে করেই হোক ওর সঙ্গে আজ আমি কথা বলবোই। ও কোন সমস্যায় পড়লো কি না তাও তো জানি না। নুসু আর মিমের সঙ্গে আলাপ করি। তারা আদিত্যর সাথে যোগাযোগের কোন পথ দেখাতে পারে না। আমি প্রতিদিন কয়েকবার করে আদিত্যকে ফোন দিতে থাকি। ওর আইডি ঘাঁটাঘাটি করতে থাকি। কোন লাভ হয় না। আদিত্যর নাম্বার সবসময় বন্ধ পাই। ওর ফেসবুক আইডি ডিজেবল পাই।
আমার মনের অস্থিরতা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ভেতরে ভেতরে আমি ছটফট করতে থাকি। হঠাৎ একসময় মনে পড়ে আমাদের ক্যান্টিনের একজন ওয়েটার আছে। আদিত্যর এলাকার। আশরাফুল নাম। ওই ছেলেটা আদিত্যর প্রতিবেশি। একদিন আমাদের সবার সাথে আশরাফুলকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো আদিত্য। মনে পড়ে আমার। নুসু আর মিমকে নিয়ে আমি দ্রুত ছুটি ক্যান্টিনের দিকে। প্রায় এক দৌড়ে পৌঁছে যাই আমরা। কিন্তু ক্যান্টিনের ভেতরে প্রবেশ করে আমার হতাশা আরও বাড়ে। কোথায় খুঁজে পাই না আশরাফুলকে। আমি ম্যানেজারকে জিজ্ঞসে করি, ভাই আপনাদের ক্যান্টিনের ওয়েটার আশরাফুল আজ কাজে আসেনি? আমার কথায় মেজাজ খারাপ করা দৃষ্টিতে তাকায় ম্যানেজার। একই রকম ভং্গিতে আমাকে বলে, আশরাফুল আপনার কে হয়?
বলি, কেউ হয় না। ওর দরকার।
প্রায় খেঁকিয়ে ওঠে ম্যানেজার, ্্ওই ফাজিল ছেলেকে আপনি পাবেন কই? ও তো আজ দশদিন হলো কাজেই আসেনি। যত্তসব বেয়াদব পোলাপান আসে এখানে কাজ করতে।
আমি মন খারাপ করা ভঙ্গিতে বলি, ভাই ওর ফোন নাম্বারটা কি একটু দেয়া যাবে?
‘ফোন নাম্বার দিয়া কি করবেন? ওর ফোনই তো বন্ধ।’
আমি, আমরা হতাশ মনে রুমে ফিরি।
পরদিন আবার যাই ক্যান্টিনে, আশরাফুলকে পাই না। আদিত্যকে ফোন করি, পাই না। তৃতীয় দিনের চেষ্টায় আমরাফুলকে পেয়ে যাই ক্যান্টিনে। পেয়েই ওকে হাত ধরে একপাশে ডেকে নিয়ে আসি। উৎকন্ঠিত কন্ঠে বলি, এই ছেলে এতোদিন কাজে আসোনি কেন?
আশরাফুল কোন উত্তর করে না। মাথা নিচু করে থাকে।
আদিত্যর কথা জিজ্ঞেস করতে অনেক লজ্জা লাগছিলো আমার। তবু আমার ভেতরের চাপা কষ্ট নেভাতে লজ্জার মাথা খেয়ে শেষ পর্যন্ত বলেই ফেলি, আদিত্যকে চিনতে না তুমি? তোমাদের পাড়ার আদিত্য? ওর কয়েকদিন হলো কোন খোঁজ খবর পাচ্ছি না। ওর সাথে তোমার দেখা হয়? কি হয়েছে ওর? কোন অসুখ টসুখ হয়েছে নাকি?
আশরাফুল মুখ নিচু করেই থাকে। একটু পর যখন মুখ তোলে তখন দেখা যায় ওর দুচোখে জল টলমল করছে। আমি কিছু বুঝতে পারি না। আমি, নুসু, মিম আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করি। নিজেকে সামলে নিয়ে একসময় আশরাফুল মুখ খোলে, আপনি কিছু জানেন না?
আমি অবাক কন্ঠে বলি, কই না তো! কিছু হয়েছে আদিত্যর?
‘উনি তো গত সপ্তাহে মারা গেছেন।’
আমরাফুলের কথায় আমি যেন হঠাৎ আকাশ থেকে পড়ি। আমার প্রাণবায়ু যেন বেরিয়ে যেতে চায়, কি? কি বলছো এসব?
আমরাফুল কান্না বিজড়িত কন্ঠে বলে, হ্যাঁ। আমাদের এলাকায় একটা রোড এক্সিডেন্টে আদিত্য মারা গেছেন গত সপ্তাহে। স্পট ডেথ। অথচ এতো ছোট এক্সিডেন্টে কারো মারা যাবার কথা না। শুধু মাথাটা একটু ফেটে গিয়েছিলো। আর কিছু হয়নি। উনার বাইকটারও কিছু হয়নি!
তখন আমার জ্ঞানশুন্য অবস্থা। মাথা ঘুরিয়ে কখন যে পড়ে গিয়েছিলাম, টের পাইনি। একটু পর দেখলাম নুসু আমার চোখ মুখে পানি দিচ্ছে। আমার শরীরে কোন শক্তি আছে বলে মনে হয় না । আমি ঠিকমতো দাঁড়িয়েও থাকতে পারি না। দুজনে পাঁজকোলা করে আমাকে রিকশায় উঠিয়ে নেয়। হোস্টেলে এসে সিঁড়ি ভাঙ্গতে পারি না। সবাই আমাকে ধরে ধরে রুমে নিয়ে আসে। এর ওর কন্ঠে ঈষৎ শুনতে পাই প্রায় একই ধরণের কথা, কি হয়েছে? কি হয়েছে পিউয়ের?
সে রাতের পরে আর কিছু মনে নেই আমার। সকালে শুনি, ডাক্তার এসে ইনজেকশন দিয়েছে, ঘুমের ওষুধ দিয়েছে, স্যালাইন দিয়েছে। সকালে জেগে দেখি আমার সারা শরীর জুড়ে ব্যথা । মাথাটা একদম তুলতে পারছি না। এরকম অবস্থাতেই নুসু কয়েক লোকমা দুধ ভাত খাইয়ে দেয় আমাকে। আমি আবারও ঘুমিয়ে যাই। বিকেলে ঘুম ভাঙ্গে আমার। চোখ বোঁজা অবস্থাতেই টের পাই কে যেন পরম আদরে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। চোখ মেলে দেখি আম্মু। আম্মুকে দেখে আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। ডুকরে কেঁদে উঠে আম্মুকে জড়িয়ে ধরি। অনেকক্ষণ ধরে কাঁদি আম্মুর বুকে মুখ লুকিয়ে। আমার এ অবস্থা দেখে আম্মুও কেঁদে ফেলেন।
সন্ধ্যায় গ্রামের বাসায় আনা হয় আমাকে। নুসু, মিমকেও আনা হয় আমাকে সঙ্গ দেবার জন্য। ওরা সবসময় আমার সাথে গল্প করে। হাসাহাসি করে। আমার মন ভালো রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু কেন যেন ওদের কোন কথাই আমার ভালো লাগে না। খুব বিরক্ত লাগে। মাঝে মাঝে আমার ব্যাচমেট, আমার ফ্রেন্ডরা ফোন করে আমাকে, আমার মনকে ভালো রাখার চেষ্টা করে। আব্বুও সকাল বিকেল বিদেশ থেকে ফোন করে আমাকে শান্তনা দেন, কাঁদেন। আব্বুর কান্নায় শুনে আমিও কাঁদি। বাবা-মেয়ে দুজনেই কাঁদি। বহুদিন এভাবে কাঁদা হয়নি আমার। এখন কেমন যেন একটুতেই আমার কান্না পায়। কাঁদি। কেঁদে কেঁদে নিজেকে হালকা করি। এভাবেই দিন পার হয় আমার । রাত আসে। আমি কখনও শান্ত হই। কখনও অস্থির হয়ে উঠি। আমাকে নিয়মিত ইনজেকশন দেয়া হয়। ঘুমের অষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়ানো হয়।
আমি প্রায় সময়ই আদিত্যর গিফট দেয়া মোবাইলটার দিকে তাকিয়ে থাকি। এই বুঝি আদিত্য ফোন দেবে আমাকে। এই বুঝি এসএমএস আসবে তার, এ্যাই কি করছো তুমি এখন? সব বাদ, চলো ঘুরি তোমাকে নিয়ে। আমি অবলিলায় চেয়ে থাকি ফোনের দিকে। কোন কল আসে না। কোন এসএমএস আসে না।
ডুয়েল সীমের এই কার্ড ফোনটা আদিত্য এ বছর ১৪ই ফেব্রুয়ারী উপলক্ষ্যে গিফট করেছে আমাকে। আমার স্মার্ট ফোন দিয়ে আদিত্যর সাথে কথা বলা যেতো না একটা সমস্যার কারণে। আদিত্য মন খারাপ করতো আমার সাথে ফোনে কথা বলতে না পেরে। ও বলতো, সকালে ও রাতে আমার ঘুম ঘুম কন্ঠ নাকি ওর ভীষণ ভালো লাগতো। তাই এই ফোনটা কিনে দিয়েছিলো ওর সাথে নির্বিবাদে কথা বলার জন্য। এ ফোন দিয়ে ওর সাথে বেশি কথা বলাও হয়নি। কয়েকদিন মাত্র টুকটাক কথা বলা হয়েছে।
আদিত্য ভদ্র ছেলে। আমি বিরক্ত হই এরকম কোন কাজই করতো না সে। বেশি কথা বলার জন্য চাপাচাপিও করতো না। সে সব সময় আমার ইচ্ছেটাকেই প্রাধান্য দিতো।
এই ফোনটা কিনে দেওয়ার পরদিন থেকে একটা ঘটনা ঘটলো। তিন চার দিন আদিত্যর কোন ফোন নেই। আমার সাথে যোগাযোগ নেই। পরে আমি ফোন দিয়ে বললাম, কি ব্যাপার! তুমি আমাকে এ কয়দিন ফোন দাওনি কেন? আদিত্য হেসে বলেছিলো, আসলে আমি চাইছিলাম তুমি আমাকে ফোন দিয়ে বলবে, তোমার কিনে দেয়া ফোন দিয়ে তোমাকেই প্রথম ফোন দিলাম।
দুসপ্তাহের সবার চেষ্ঠায় আমি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠি। বাসায় নুসু, মিম, আম্মু। দূরে আব্বু, ফ্রেন্ডরা। সবার চেষ্টা আর সহযোগীতায় আমি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠি। নিজেকে বোঝাই। মনকে বোঝাই। আদিত্যর সাথে আমার প্রেমের কোন সম্পর্ক ছিলো না। ওর সাথে আমার বৈবাহিক কোন সম্পর্কও তৈরি হতো না। সম্ভবও ছিলো না। যেটুকু সম্পর্ক তৈরি হয়েছিলো তা শুধুই মনের টান। এ টানে সামান্য ভালোবাসাও ছিলো বটে। এর বাইরে কোন কিছু নয়। ও কখনও আমাকে স্পর্শ করেনি। আমার হাত ধরেনি। আমাকে কিস করেনি। আমাকে জড়িয়ে ধরেনি। কিন্তু ওর প্রতি আমার দুর্বলতার জায়গা অন্য কোথাও। আদিত্য আমাকে খুব অল্প সময়ে বুঝেছে। আমাকে সম্মান করেছে। আমাকে সময় দিয়েছে। সহযোগীতা করেছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, আদিত্য আমার মনের ভাষা বুঝতো। এরকম কেউ কখনও আমাকে কোনদিন বোঝেনি। এজন্যই ওর সাথে এক ধরণের সুসম্পর্কে জড়িয়ে গিয়েছিলাম আমি। আমার কেন যেন মনে হয়েছিলো, জীবনে চলার পথে এরকম একজন ছায়াসঙ্গীর খুব প্রয়োজন আমার। এজন্য ওর সাথে নিজেকে জড়িয়েছিলাম একটু ভালো থাকবো বলে। কিন্তু নিয়তির কি নির্মম পরিহাস! মাত্র ছয় মাসের এক সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেইে আদিত্যর মতো একজন সুবন্ধুকে হারালাম আমি। একটা দ্রুতগামী চলন্ত প্লেন সঠিক গন্তব্যে পোঁছার আগেই মাঝপথে ক্রাশ করে ধুলিস্মাৎ হয়ে গেলো! একটা তরুন, তাজা প্রাণ অকাতরেই ঝরে গেলো কিছু না বলে! এটা মানতে পারি না আমি। ভাবতেই পারি না আমার প্রিয় আদিত্য আর পৃথিবীতে নেই!
ফের হোস্টেলে ফিরি আমি। কিন্তু রুমে ঢুকতেই হু হু করে কেঁদে ওঠে আমার নরম বুকটা। বিভিন্ন উপলক্ষ্যে দেয়া আদিত্যর গিফট গুলো আমার রুমে থরে থরে সাজানো। কাঁচের চুড়ি, লিপস্টিক, ফেয়ারনেস ক্রিম, হানি সোপ, শাড়ি, বিভিন্ন ধরণের বিস্কিট। আরও কত কি! এই গিফট গুলোর সাথে আদিত্য আর আমার বহু সুখ স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বহু রাগ, অভিমান, ঝগড়া জড়িয়ে আছে। আদিত্যর গিফটগুলোকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদি আমি।
আদিত্যকে যদি বলতাম, আদিত্য ভালো লাগছে না। আমাকে বাইরে থেকে ঘুরে নিয়ে এসো। আদিত্য ছুটে আসতো। আমাকে নিয়ে ঘুরতো। খাওয়াতো। যদি বলতাম, ক্ষুধা লেগেছে। আদিত্য খাবার কিনে দিয়ে যেতো। যদি বলতাম, রাত হয়েছে বাইরে যেতে পারবো না। ফোনে টাকা শেষ। আদিত্য ফোনে টাকা দিয়ে দিতো। যদি বলতাম, আমার এটা প্রয়োজন, ওটা প্রয়োজন, সেটা প্রয়োজন। কোনটাতে, কোন কিছুতে না করতো না। আদিত্যর কাছে যখন যা চাইতাম তাই দিতো। এক আশ্চর্য এবং অদ্ভ’ত রকমের প্রাণী আদিত্য।
বিকেলে আমাকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হয় ইকো পার্কে। ওখানে আদিত্যর সাথে আমার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আমি কেঁদে ফেলি। আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় মম-ইন চত্বরে। আমি কেঁদে ফেলি। আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়, ক্যান্টিনে । কফি খেতে। আমি কেঁদে ফেলি। সবখানেই আমি আদিত্যর শারিরীক উপস্থিতি লক্ষ্য করি। যেখানেই বসি মনে হয় আদিত্য আমার পাশে বসে আছে। আমার সাথে হেসে হেসে গল্প করছে। দুষ্টুমি করছে। আমি কেঁদে ফেলি। নুসুকে বলি, আমাকে আদিত্যর কবরের কাছে নিয়ে চল। আমি আদিত্যর কবর দেখতে চাই।
পরদিন একটা সিএনজি ভাড়া করে নুসু আর মিম আমাকে আদিত্যর গ্রামে নিয়ে যায়। দুএকজনকে জিজ্ঞেস করার পর আদিত্যর বাসা খুঁজে পাওয়া যায়। ভেতরে প্রবেশ করি আমরা। এ বাসায় আদিত্যর বউ বাচ্চারা এখন থাকে না। আদিত্য যখন বেঁচে ছিলো, তখন থাকতো। এখন আদিত্যর বউ বাবার বাড়ি চলে গেছে ছেলেদের নিয়ে। ওর মেজ ভাবীর কাছ থেকে চাবি নিয়ে আদিত্যর ঘরটা খুলি আমি। এটা এখন একটা পরিপাটি শুন্য ঘর। ঘরের সবকিছু সুন্দর করে সাজানো, গোছানো। আমি আস্তে আস্তে ওর খাটে বসি। এই খাটে শুয়ে শুয়ে আদিত্য টিভি দেখতো। আমাকে এসএমএস করতো। কখন কি নাটক দেখছে তার পিক পাঠাতো। আদিত্যর তিনটা প্রিয় বিড়াল, তার পিক পাঠাতো। সেলফি পাঠাতো। আমিও পাঠাতাম। এখানে শুয়ে শুয়ে কতো রাতভর যে গল্প করতো আমার সাথে! এখন আর আদিত্য আমার সাথে গল্প করে না!
শো-কেসে আমার দেয়া কয়েকটা গিফট আইটেম দেখি। কয়েকটা বই, কয়েকটা কলম, একটা ডায়েরি। গিফটগুলো আদিত্যর জন্মদিন সহ বিভিন্ন উপলক্ষ্যে দিয়েছিলাম আমি। আদিত্যকে তেমন বেশি গিফট দেইনি আমি। কিন্তু যে কটাই দিয়েছি সেগুলো খুব যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছে পাগলটা।
আলনায় ওর কালো কোর্ট প্যান্টের দিকে চোখ যায় আমার। সাদা শার্ট ,কয়েকটা গেঞ্জি ঝোলানো। ওর কালো কোর্ট প্যান্টের দিকে চোখ আটকে যায় আমার। কালো আমার প্রিয় বলে নিয়মিত এই একই কোর্ট প্যান্ট পরে আসতো আদিত্য। একদিন আমি বিরক্ত হয়ে বলি, অ্যাই তুমি কি! প্রতিদিন এই এক কোর্ট প্যান্টই পরে আসো? নোংরা হয়েছে দেখতে পাও না? কেমন বোঁটকা গন্ধ বেরুচ্ছে?
আদিত্য অনেক লজ্জা পায়। মাথা নিচু করে বলে, আসলে কালো তোমার প্রিয় কালার তো তাই। ব্যাস্ততায় এবার ধোয়া পড়েনি। আদিত্যর সেদিনের কথাটা আমার অনেক ভালো লেগেছিলো।
আদিত্যর রুমে বসে বেশিক্ষণ কাঁদার সময় পেলাম না আমি। জীবনের প্রথম ও শেষ বারের মতো ওর খাটে বসে ওর স্মৃতিচারণ করার সময় পেলাম না। সিএনজি চালকের ডাকাডাকিতে অবশেষে নিচে নামতেই হয় আমাদের। রওনা দেবার সময় মনে হলো, আর হয়তো আসা হবে না আমার প্রিয় মানুষটার আবাসভুমিতে! এটাই শেষ বার!
সিএনজিতে চেপে দ্রুত চলে গেলাম আদিত্যর কবরের পাশে। একটা ফাঁকা জমির উপরে, খানিকটা জঙ্গলা জায়গা। আদিত্যর বাসা থেকে এ জায়গাটা খানিক দূরে। এখানেই নিথর দেহে শুয়ে আছে আমার আদিত্য। কবরের উপরে দেয়া বাঁেশর নলা আর খেজুরের ডাল এখনও সতেজ। এর মধ্যেই, এই জঙ্গলা জায়গার মধ্যেই অন্ধকার কবরে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে আদিত্য। অথচ বাসায় এসি না ছাড়লে ও ঘুমোতে পারতো না। রাতে একা একা রুমে থাকতেও কখনও কখনও ভয় পেতো!
আদিত্যর কবরে দাঁড়িয়ে নিজেকে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারি না আমি। হু হু করে ডুকরে কেঁদে ফেলি। আমার হৃদয় অন্তর সব দুমড়ে মুছড়ে আসতে চায়। আমি মাটিতে বসে পড়ি। নুসু, মিম দুপাশ থেকে কাঁদতে কাঁদতে আমাকে ধরে রাখে। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা আদিত্যর ভাবী নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিতে থাকে।
আদিত্যর কবরে বসে বসে অনেকক্ষণ কাঁদি আমি। আমি জানি আমার কান্না কবর থেকে শুনতে পাচ্ছে শয়তানটা। জানতে পারছে, ওর হঠাৎ এভাবে চলে যাওয়া কতোটা শুন্যতা তৈরি করেছে আমার এ বুকে। মনে মনে বলি, বেঁচে থাকতে তোমাকে চিনতে পারিনি আদিত্য। কিন্তু আজ তুমি চলে যাওয়াতে বুঝলাম, কতোখানি জায়গা তৈরি করে নিয়েছো আমার এ শুন্য বুকে! প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া এ পৃথিবীতে নিষ্ঠুর সময়ের স্রোতে একদিন আমিও হয়তো ভুলে যাবো তোমাকে। একদিন স্বামী, সংসার, সন্তান , চাকরি এসব নিয়ে আমারও পার হয়ে যাবে ব্যাস্ত সময়। সময়ের সাথে সাথে হয়তো ফিকে হয়ে যাবে তোমার সাথে আমার কিছু সময়ের সুখস্মৃতি। কিন্তু বিশ্বাস করো আদিত্য, তোমাকে আমি কোনদিনও ভুলে যেতে চাইবো না। যান্ত্রিক জীবনের তাড়নায় যখন হাঁফিয়ে উঠবো, একটু স্বস্তির আশায় যখন নির্জন কোথাও বেড়াতে যাবো একাকি। তখন ঠিক মনে পড়বে তোমাকে আমার। আমার স্মৃতিময় অতীত ঘাঁটতে গিয়ে ঠিকই আমার মনের মনিকোঠা থেকে বেরিয়ে আসবে তুমি। কথা দিলাম, তোমাকে ভুলবো না আমি। কোন দিন, কোন কালে। যখন জীবনের যে প্রান্তেই থাকি, বছরে অন্তত একবার এসে দেখা করে যাবো তোমার সাথে। প্রমিজ আদিত্য, প্রমিজ!

0 Comments