যাহিদ সুবহান এর গল্প “বাউন্ডুলের এপিটাফ“


মফস্বল শহরের রিক্সাস্ট্যান্ড। সকাল থেকেই একটা গুঞ্জন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। খবরটা সত্যি কিনা কেউ জানে না। ছোট্ট এই এলাকার চল্লিশভাগ মানুষ এ ঘটনা বিশ্বাস করে তবে এ বিশ্বাসে ঘাটতি আছে। বাকী ষাট ভাগ মানুষ এ ঘটনা অবিশ্বাস করে দৃঢ়ভাবে। তাদের এই দৃঢ়তায় কোন ঘাটতি নেই। তারা মনে করে এ কোনভাবেই সম্ভব নয়। রিক্সাওয়ালা থেকে চা ওয়ালা-মুদি দোকান্দার- কসাই-মুচি-সবজিওয়ালা এমনকি বাজার স্টেশনের পাশে বড় কড়ই গাছতলায় সারাদিন হুইল চেয়ারে বসে থাকা প্রতিবন্ধী হেলালও এ খবর শুনে অবাক; তবে বিশ্বাস করতে পারে না। যখন রফিক সাহেবের বিষয়টি ওঠে তখন কেউ কিছু বলে না শুধু একে অন্যের দিকে তাকিয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। খবরটি সবার কানেই পৌছেছে তবে কেউই উচ্চবাচ্য করছে না। খবরটিও ভয়ঙ্কর! গতরাতে নাকি মাছুমপুর মহল্লার রফিক সাহেব গলায় দড়ি দিতে গিয়েছিলেন। অল্পতে তিনি এই মহাসর্বনাশ থেকে রক্ষা পেয়েছেন। আত্মহত্যা করা মহাপাপ। এমন কাজ কি কোনভাবে রফিক সাহেবকে সাজে? না তিনি এ কাজ করতে পারেন না। যদিও বিষয়টি এখনো প্রমাণিত নয়। তবে এ খবরে সবাই অবাক। সবার ঐ একই কথা,‘এ কী করে সম্ভব!’


রফিক সাহেব অতি সজ্জন ব্যক্তি। সরকারি একটা অফিসে চাকরি করেন। তিনি অন্য জেলার মানুষ হলেও এই একই স্টেশনে আছেন পনেরো বছর ধরে। এ সময়ে বেশ কয়েকজন বড় বাবু এসেছেন-গেছেন কিন্তু রফিক সাহেব থেকেই গেছেন। বড় বাবুরা কোনভাবেই রফিক সাহেবকে ছাড়তে চান না। এর বিশেষ কারণ আছে। রফিক সাহেব অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তার সকল কাজ করেন। অফিসের অন্যরা যখন নানা অজুহাতে কাজে ফাঁকিতে ব্যস্ত; রফিক সাহেব তখন কাজ নিয়ে ব্যস্থ থাকেন। কারো সাথে কোন বাধাবাধিতে নেই। খুব কম কথা বলেন। অন্যরা যখন অবসরে নানা খোশগল্পে ব্যস্ত তখন দেখা যাবে রফিক সাহেব অন্য কাজ করছেন নয়তো পত্রিকা পড়ছেন নয়তো কোন বই। নৈমিত্তিক ছুটি, বার্ষিক ছুটি নেন খুব কম। এ নিয়ে মাঝেমধ্যে বউয়ের কটুকথাও শুনতে হয় তাকে। অফিসের অন্যরা অস্ফুট ভাষায় বলেই ফেলেন,‘কাজপাগল লোক!’


অফিসেই রফিক সাহেব শুধু নিষ্ঠাবাণ মানুষ তা নয়। প্রতিবেশীদের কাছেও তিনি খুব শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। রিক্সাওয়ালা থেকে চা ওয়ালা-মুদি দোকান্দার-কসাই-মুচি-সবজিওয়ালা সকলেই তাকে ভক্তি করেন। গত দেড় দশকে উচ্চবাচ্য তো দূরে থাক এই এলাকার কারো সাথে কথাকাটিও করতে দেখেনি তাকে কেউ। বাড়িওয়ালা-ফেরিওয়ালার সাথেও কোনদিন লাগে নি তার। কেউ কেউ যে কোনদিন বাধাতে চায় নি তা নয় কিন্তু রফিক সাহেব নিজে একরকম পরাজয় স্বীকার করে সব বিতর্ক থেকে সরে এসেছেন। রফিক সাহেবের স্ত্রী লুৎফুন্নেছাও একই রকম মানুষ। যেন নরম মাটি দিয়ে গড়া। তার সাথে এ পাড়ার কারো বাধাবাধি নেই। সারাদিন হারখাটুনি খেটেও চেহারায় সামান্য ক্লান্তি-শ্লেষ নেই। এ যুগে এমন রমণী পাওয়া দুষ্কর বলে মনে করেন মাসুমপুর মহল্লার মানুষ। যেন সাক্ষা লক্ষী! এ সংসার জীবনে তাদের তিন সন্তান। দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে তুষার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন করে চাকরির চেষ্টা করছে। খুব মেধাবী ছেলে। ঈশ্বর রফিক সাহেবের সংসারে যেন নিজের হাতে তুষারকে দিয়েছেন। বাবার স্বভাব পেয়েছে ছেলেটা। খুব নরম স্বভাবের লুৎফুন্নেছা আহ্লাদ করে বলেই ফেলেন তুষার আমার ছেলে নয়, ও আমার মেয়ে। ছোট মেয়ে তিথি সবে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। আর মেজছেলে আহমেদ মোর্শেদ, সকলে ওকে লিটু বলেই ডাকে। 


রফিক সাহেবকে কয়েকদিন ধরেই অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে। কী যেন এক দুঃশ্চিন্তা তাকে ঘিরে রেখেছে ইদানিং। বিষয়টি অনেকেই খেয়াল করছে তবে রফিক সাহেব কিছ্ইু বুঝতে দিচ্ছেন না। লিটু রফিক সাহেবের এ যন্ত্রণার অন্যতম কারণ। গতকালের ঘটনা যদিও এখনো সঠিকভাবে উদঘাটন হয় নি তবুও সবাই মনে করে এ ঘটনা ঘটলে ঘটতেও পারে। রফিক সাহেবের মতো এমন মাটির মানুষের ঘরে তো লিটুর মতো হারবজ্জাত ছেলে আছে। হয়তো গতরাতের ঘটনা গুজব। আর সত্যও হতে পারে। তবে সকলে ঘটনাটিকে গুজব বলেই উড়িয়ে দিতে চায়!


লিটু এবার মাধ্যমিকের ছাত্র। ওকে নিয়ে রফিক সাহেব পড়েছেন বিপাকে। ছেলেটা দিন দিন বকে যাচ্ছে। পড়াশোনায় কোন মনোযোগ নেই। বড্ড বদমেজাজী হয়ে উঠছে। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সী ছেলের এমন খিটখিটে মেজাজ দেখলে অবাক হতে হয়। সারাদিন মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকে। লিটু ইদানিং অদ্ভ’ত সব আঁচরণ করছে। যখন ওর সহপাঠীরা ক্লাসে মুখগুজে গণিত স্যারের সমাধান নিয়ে ব্যস্ত তখন লিটুকে দেখা যাবে অন্যমনস্ক হয়ে ক্লাসে বসে আছে। স্বল্প আয়ের মানুষ হলেও লিটুর জন্য দুটি টিউশনির ব্যবস্থা করেছেন রফিক সাহেব। টিউটর বাড়ি এসে পড়ায়। কিন্তু সেখানেও লিটুর কোন মনোযোগ নেই। স্যারদের কোন পাত্তাই দিতে চায় না সে। লিটুর আঁচরণে স্যাররা পারলে পালায়। ওর অন্য বন্ধুরা যখন বিকেলে মাঠে খেলছে তখন লিটুকে দেখা যাবে নদীর ধারে একা একা হাঁটছে। প্রায় ছেড়া পূরোনো শার্ট-প্যান্ট, ছেড়া স্যান্ডেল পরে এমন উদ্ভট চেহারা নিয়ে ঘুরছে যে মনে হবে মাদকাসক্ত কোন টোকাই ঘুরছে। উদাস মনে ওর হাঁটা দেখে অনেকেই মনে করতে পারে বাউন্ডুলে এক ছেলে। আবার সন্ধায় যখন বন্ধুরা আড্ডায় ব্যস্ত তখন ওকে দেখা যাবে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। আবার রাত বারোটার পর যখন সকলে ঘুমাচ্ছে তখন ওকে দেখা যাবে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে রেললাইন ধরে একা হাঁটছে। হয়তো প্ল্যাটফর্মের মতির দোকানে রঙচায়ে ফুঁকিয়ে ফুঁকিয়ে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। জ্যোস্নারাতে দেখা যাবে মহল্লার বিশাল খেলার মাঠে সবুজ ঘাসে শুয়ে আছে গভীর রাত অবধি। লিটুর আঁচরণ অন্যরাও লক্ষ্য করে। রফিক সাহেবের কাছের মানুষ দুয়েকজন মন্তব্য করেন হয়তো লিটু মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। রফিক সাহেব একথা শুনে আরো উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। তবে তিনি একথা বিশ্বাস করতে চান না। তার লিটু মাদকাসক্ত হতে পারে না। কতো নম্র-সভ্য ছেলেটা তার। এমন তে পারে না। পঞ্চম আর অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়া তার অবুঝ ছেলেটার কী হলো! রফিক সাহেবের হতাশা বাড়ে। 


সামনে টেস্ট পরীক্ষা। বাবা মা লিটুর পড়ার টেবিলের পাশে মাথায় হাত বুলিয়ে অনেক বুঝিয়েছে। এর আগে অনেক শাসন করা হলেও কোন দেয় নি। তাই রফিক সাহেব অনেকটা অদৃষ্টের হাতেই ছেড়ে দিয়েছেন সব। রফিক সাহেব ভাবেন ছেলেটা কোনরকম পাশ করলেই হয়। পরীক্ষায় তো বসুক! রফিক সাহেবের মানসিক অবস্থা অফিসের সহকর্মীরা বুঝতে পারেন। রফিক সাহেবকে ইদানিং খুব মনমরা দেখা যায়। এমনিতে কমকথা বলা লোক বিষণ্ন হলে তাকে আরো বিভৎস দেখায়। পরীক্ষা শুরু হলে লিটু পরীক্ষায় বসে। একটি পরীক্ষা যায় রফিক সাহেব হাফ ছেড়ে বাঁচেন। অন্তত একটি পরীক্ষা তো শেষ হলো। এভাবে একদিন পরীক্ষা শেষ হয়। আশেপাশের অনেকেই মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে কথা বললেও রফিক সাহেব সেসব আলোচনায় যোগ দেন না। বরং এড়িয়ে চলেন। তার এক ছেলে যে ফলপ্রার্থী তাকে তেমন মনে হয় না। তিনি র্নিকার থাকেন। সোমবারে ফল বের হয়, সকালেও রফিক সাহেবকে অন্যদিনের মতো দেখায়। দুপুরবেলা হঠাৎ সকলে লক্ষ্য করে রফিক সাহেব তড়িঘড়ি অফিসের কাজ গুছিয়ে বের হচ্ছেন। তার মুখের কোনে এক চিলতে হাসি। এ হাসি শরৎকালের আকাশে জমে থাকা মেয়ের পাশে এক চিলতে রোদের মতো। সবাই দেখলো রফিক সাহেব শহরের সবচেয়ে পূরোনো এবং ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকানের দিকে ছুটছেন! 


                   


Post a Comment

0 Comments