Poetry of Lutfa Shaheen



 একটি কবিতার জন্যে


কবিতা কবির কাছে ভাবের এক নির্মোহ জায়গা, ভাব-কল্পনার জায়গা ও মনীষার আঁধার-মনন ও দর্শনের প্রতীতি। ভাবকে দর্শনের জায়গা থেকে আলাদা দেখতে চাই। হার-হাড্ডির মাংসের যে সম্পর্ক কবিতার সাথে কল্পনাপ্রতিভা, চিন্তা ও ভাবদর্শনের সম্পর্ক  সে রকম। আসলে কবিতার মূল উপাদান হলো ভাব ও শব্দ। আর এই  কেন্দ্রীয়ভাব মূলত কল্পপ্রভাময় দার্শনিকতা ও প্রতিজ্ঞার নির্মিতি। তাই বলে কবিতা দর্শন নয়। এ সময়ের কবিতা নিয়ে অনেকেরই অনেক মত- কেউ বিদর্পে নব্বইকে অস্বীকার কেউ প্রথম দশক থেকে বেরিয়ে আসা অথবা দশক বিভাজনের জটিলতায় হাবুডুবু খাচ্ছে। এ প্রজন্মের কবিতায় মানুষের অসহায়তা, ক্ষণিক আনন্দের, বিরহের অনলসু, অথর্ব মানুষের মোড়লীপনা, মানবিকপ্রেম, মনোবৈকল্য,  স্নেহপ্রবণতা, কাম ও কামশীতলতা প্রকৃতির  খেয়ালীপণা, নিষ্ঠুর এবং নান্দনিক, মোহনীয় নানা অনুসঙ্গকে ভর করে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রমানসহ চিন্তা ও চেতনায় এক বিশেষ উপলব্ধির প্রকাশ করছে। লক্ষ করা যায় নব্বইয়ের পরে কবিতায় সালঙ্কৃত হওয়ার পরও অলঙ্কারের ভারে ন্যুজ্জ্ব হয়ে পড়ে না। বরং অনেকক্ষেত্রে চৌষট্টিকলায় পরিপূর্ণ হয়ে ছত্রিশ ব্যঞ্জনায় বেজে ওঠে এক ঐন্দ্রিয়জালিক চিত্রকল্পের জাদুতে। এদের কবিতা ঢেউ এবং  স্রোতের বিপরীতে  অবস্থান প্রচণ্ড শক্তিশালী বাঁকনির্মাণ কৌশলী তাঁদেরকে  মোহগ্রস্ত করে রাখে।দশক বিভাজন কবিতার আলোচনার বিষয় হতে পারে না। তবে দশক কবির বয়স ও অভিজ্ঞতা এবং  দায়িত্ব অনুভব প্রকাশের মাধ্যম হতে পারে। তাই আমরা ‘শিল্পরীতির ঋষি’ বলে কোনো দশককে ভিত্তি করে কবিদের নিহ্নিত করতে পারি না। দেখতে পারি নির্মানের অনুস্বরণ অনুকরণ আর উত্তরণের ক্রমাগত ধারা কতোটা অংশ অনিবার্য করে আড়াল করেছে। আর এ কারণেই সময়ের প্রয়োজন। যাকে আমরা এখানে শূন্য- এবং প্রথম দ্বিতীয়দশক বলে বিবেচনা করেছি। কবিতা একটি মৌলিক বিষয় এর উৎকর্ষ সাধন কোনো কালেই নির্দিষ্ট নয়। এটা নির্ভর করে মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা। শিক্ষা সাংস্কৃতিক রুচি, বয়স ও তার জেনেটিক ফ্যাক্টরের ওপর। কবি নিজেই একটি স্বয়ংভূসৃষ্টিকর্ম  আর তাকে মাধ্যম হিশেবে ব্যবহার করতে হয় সময় আভির্ভাব হয়ে।দশক বিভাজন কবিতার আলোচনার বিষয় হতে পারে না। তবে দশক কবির বয়স ও অভিজ্ঞতা এবং  দায়িত্ব অনুভব প্রকাশের মাধ্যম হতে পারে। তাই আমরা ‘শিল্পরীতির ঋষি’ বলে কোনো দশককে ভিত্তি করে কবিদের নিহ্নিত করতে পারি না। দেখতে পারি নির্মানের অনুস্বরণ অনুকরণ আর উত্তরণের ক্রমাগত ধারা কতোটা অংশ অনিবার্য করে আড়াল করেছে। আর এ কারণেই সময়ের প্রয়োজন। যাকে আমরা এখানে শূন্য- এবং প্রথম দ্বিতীয়দশক বলে বিবেচনা করেছি। কবিতা একটি মৌলিক বিষয় এর উৎকর্ষ সাধন কোনো কালেই নির্দিষ্ট নয়। এটা নির্ভর করে মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা। শিক্ষা সাংস্কৃতিক রুচি, বয়স ও তার জেনেটিক ফ্যাক্টরের ওপর। কবি নিজেই একটি স্বয়ংভূসৃষ্টিকর্ম  আর তাকে মাধ্যম হিশেবে ব্যবহার করতে হয় সময় আভির্ভাব হয়ে । কবিতা এক ধরণের বিনিময়-আবেগের বোধের আর শিল্পের। কবিতার সার্থকতা সেখানেই -ওঃং ভরফবষরঃু ঃড় রঃং ড়হি হধঃঁৎব. অনেকে মনে করেন সবধহং ঃড় সবধহরহম -কে বোঝানো হয়। আমরা বলে থাকি ওর কবিতা হচ্ছে ওর কবিতা হচ্ছে না-বিষয়টি আসলে সর্বদাই রহস্যঘন। যেন একটা মিষ্টিক কুয়াশায় কখন কেমন করে কবিতার আবরণে-অবয়বে পরিগ্রহণ করে ফেলে। এবং এখানে প্রকৃতিই প্রধান ভূমিকার কাজ করে। প্রকৃতি হচ্ছে ঊহফষবংং রহাবহঃরড়হ, বহফষবংং বীঢ়বৎরসবহঃ. বিষয়টি নিশ্চয়ই হৃদয়ঙ্গমঘটিত ব্যাপার।


২.

কবিতা কখনো পরিকল্পনা করে লেখা হয় না- লিখেও না কেউ। পরিকল্পনা বা প্রেসক্রিপশন মাফিক কেউ অন্তত কবিতা রচনা করতে পারে না। এরজন্য অধিত জ্ঞান, পাঠ আর পড়াশোনার প্রস্তুতি বোধসহ কিছুটা অনিবার্য। সমস্ত পরিকল্পনা ভেঙেচুড়ে কবিতা আপন স্বভাবে কবিকে দিয়ে কবিতা লিখিয়ে নেন। কবি যখন পরিকল্পনা করে লিখতে বসেন সে কবিতা না লেখা হয়ে লেখা হয় অন্য কবিতা- এই  হলো কবিতার নেপথ্য। প্রথমে আমার ভাবনাগুলো মগজে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ছট্ফট করে- কিছু একটা বলতে চায়, কিন্তু তা বলতে পারে না, জানেও না! 

জীবনমৃত্যুর একেবারে শেষ মুহুর্তে এসেও কবিকে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় তেমনি প্রত্যেক কবিকেও প্রতিটি কাব্যসৃষ্টির পূর্বমুহুতে এক অলৌকিক অভিজ্ঞতার কাছে দাঁড়াতে হয়। তবে হয়তো সব কবি সেই সৃজনযন্ত্রনা  থেকে অভিজ্ঞতা স য় করতে পারে না। যিনি পারেন তিনি কবি কিংবা নন।

মহাজাগতিক চিন্তাকে অতিক্রম করতে পারলে নিজেকে অতিক্রম করা যেতে পারে। জ্ঞান-কল্পনার অপার রহস্যময় ভাবনার সীমা অতিক্রম করে কবিতা জ্ঞানের আনুভুমিক আপেক্ষিক স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার হলেও কবির পাশির্^ক মূল্যবোধ, ব্যাক্তিক টানাপোড়েন, অস্তিত্বের সংকট,উৎপীড়ণে ব্যক্তিক অভিঘাত, সামাজিক কর্তব্যবোধ,সর্বোপরি বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্তিক বিন্দু থেকে দার্শনিকতায় উত্তরণের যে নষ্টালজিক আত্মিক বোধ-তার প্রকাশ স্থির বর্ণরেখার,চলমান শব্দে ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য আনুভূমিক চিহ্নে ধীরে ধীরে প্রকাশ হতে থাকে । প্রকাশ হতে থাকে কবির সৃষ্টি, কবির নির্মাণ কবির কবিতা। হয়তো কবিরাই গাছের ভাষা, পাখির ভাষা, আকাশের ভাষা, নক্ষত্র-পাহাড় এবং ফুলের ভাষা পড়তে পারে-বুঝতে পারে। তাই কবির ভাষা হয়-‘একটি ফুল ছিঁড়তেই পৃথিবী ভেঙে চুরমার’। সময় এবং প্রকৃতির মূল্য কবিরাই নিরুপন করতে পারেন। মাটি থেকে আকাশের দূরত্ব কিংবা শূন্যতাকে দৃশ্যমান করেন কবি হ্যা-শুধু কবিই। লিওনার্দো দ্যা ভিি র ‘মোনালিসা’ একটা বিখ্যাত কবিতা এন্ড দ্যা লাস্ট সাপার অব ন্যাচার-তখনই দৃশ্যময় যখন তার বাস্তবতা কাব্যের ব্যঞ্জনাময় রুপক প্রত্যক্ষ । ঠিক তখনই মানুষ বাস্তবজ্ঞানে রিয়ারিটির জন্ম দেয়। এজন্য বলা হয় শিল্প মানেই একধরনের কাব্যিক ব্যজ্ঞনাময় অপার সৌন্দর্যের কবিতা। কবিতার মৃত্যু না হলে মানুষের মৃত্যু হবে কেন! আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি-পৃথিবী সৃষ্টির পর প্রথম অনুভব-চেতনাবোধের প্রথম উচ্চারণটিই প্রথম কবিতা। 



৩.

আমি কবিতা লিখতে চাই কিন্তু কবিকেই লিখি। একটা নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশা আমাকে সর্বক্ষণ ভাবিয়ে তোলে সারাদিনমান অস্থির হয়ে থাকি। কাব্যে আমি প্রস্তুতি গ্রহণ করি মনের যন্ত্রনা আর আনন্দবোধে সেখানে শিল্পের প্রপে  ব্যাকুল উন্মাদনার নান্দনিকশব্দের প্রেমই এক বিশেষ উপলব্ধিতে অবতীর্ন হই। হয়ে ওঠে ভাবনার উদ্রেক যা মনের সাথে একাত্মতায় মিশে তৈরি করে এক একটি পঙ্ক্তি। মস্তিষ্কের অনুরণনে আমার সৃষ্টিশীল ক্ষমতার সামর্থে এক অন্তলীন ভাষা তৈরি করি আর আত্মমগ্ন হই। সেখানে কোনো জোড় থাকে না-চলেও না।  কখনো হয়তো কোনো অনিকেতচেতনা আবিষ্টতার ভাবনায় আমাকে নিমগ্ন করে। সেটা প্রত্যেক কবির নাও হতে পারে। চিন্তার যেমন নিদির্ষ্ট সীমারেখা নেই কাব্যেরও তেমন সুনিদির্ষ্ট অর্থবাধকতা নেই-স্বাধীন আর মুক্ত অর্থে কবিতার বিশেষ স্তরে পাঠকের কাছাকাছি আসতে পারে। কবির অবিমিশ্র ধারনা পাক খেতে খেতে আর মোচর খেতে  খেতে বিভিন্ন প্রপে র সমম্বয়ে স্থির হয়-যুক্তি আর রীতির আটপৌরে ধারণা ভেঙে একটি কাঠামোয় দাঁড়ায় । আমরা শিল্পের দর্শন এবং ভাবনায় পরিসীমায় সুতীব্র আবেগের বিস্তার ঘটিয়ে তা মনের খোরাক করে নিই। কবিতা কখনো আপ-টুডেট হয় না-্এ হলো সময়ের নিয়ামক। কবিতা স্বয়ম্ভ- এর বিরুদ্ধে যাওয়া যায় না আবার নিরুস্কুশ প্রক্ষপাতদুষ্ট নয়। আধুনিক কবিতার ফর্ম পালাবদলের রসায়ন-সময়জারিত কবিতার বোধ,চিন্তা-মনন- মেধা ও মননশীলতার প্রকাশ এ প্রক্রিয়ার উত্তরণ। কবি কবিতায় শব্দ প্রয়োগের সমবায় রচনা করেন তার প্রায়োগিক সাফল্যে পাঠকমনে হৃদয়ছোঁয়া নতুনের নতুনত্ব র্স্পশক করান। তাই এ কথা অনস্বীকার্য যে কবিতা অবশ্যই শব্দশিল্পকর্ম। আপনার মনোজগতে কে প্রবেশ করতে পারে-জীবন ও জগতের বিচিত্র রহস্য আপনাকে ভাবায়-গতিদান করে কিংবা নিজেকে অতিক্রমণের বেপরোয়া চিন্তা এক আশ্চর্য দক্ষতায় পরিণত করে। এই অপার ক্ষমতা শুধু কবিতাই আপনাকে দিতে পারে। 

কবিতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আমাদের আশে-পাশে আমাদের চতুর্পাশে^। মহাবিশে^ই একটা অতি মহাকবিতা-মহাকাব্য- । নিজস্ব জীবনদর্শন কারো চালিকা শক্তির হাতে পথ হারিয়ে ফেলবে না। কখনো ভুল দর্শনে কবিতা ফাঁদেও পড়বে না। অন্ধকার আর শূন্যতায় রচিত অকবিতাগুলো অন্ধকারেই হারিয়ে যাবে। নিশ্চয়ই কবির মনোজগতের গোলক ধাঁধাঁ থেকে বেরিয়ে মানুষের সর্ম্পকে আর অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হবে। সেকেলে ছন্দ প্রকরণ ভেঙে প্রবহমান-নিবিচ্ছিন্ন ছন্দের আবহে পাঠকের নিকটস্থ হবে। একজন কবিকে যতোটা না শিক্ষিত হতে না হয়, প্রয়োজনে পাঠককে তার চেযে  বেশি জানতে হয়,পড়তে হয়। বস্তুত কবিকে একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবার দরকার নেই। ভাবনায়- চেতনায় তিনি স্বশিক্ষিত।

একজন কবির কবিতা লিখতেই একসময় ছন্দ তার অন্তরঙ্গ হয়-রিনিঝিনি দোল খায়। রিদম-তাল- বোল যেনো শরীরে খেলা করে এবং অবশেষে বেঁজে থাক্-েএই তো ছন্দের জাদু। সত্যিকার অর্থে মানুষ কখনো ছন্দের বাইরে নয়। কবিতার যেমন আনন্দ আছে-আছে তার বিষাদও। এই আনন্দ-বিষাদ কাউকে দেখানো যায় না, বোঝানো যায় না। বিষযটি বোধ করি সমবেত উল্লাস করা যায়। আর কাঁদতে হলে নির্জনে যেতে হয়- আমি আমার কবিতায় উল্লাস করেছি তেমন কেঁদেছিও বহুবার।

৪.

চৈতন্যহীনতা কোনো নিরবতা নয় এমনকি নিঃ®প্রাণও নয় । বরং শিল্পির মধ্যে চৈতন্যহীনতা এক ধরনের অবস্থাও তথৈবচ বটে  । আমি মনে করি চৈতন্যহীনতার নেপথ্যে এক গভীর দর্শন কাজ করে। অস্তিত্বের জিজ্ঞাসার পীড়ন যখন জীবনের নিত্য সঙ্গি । এই পীড়ন যেমন ভাবিয়ে তোলে তেমনি প্রকাশের তাড়নাকে প্রকট করে; কিছু করতে চায় কিছু বলতে চায় -এটাই হয়তো প্রস্তুতি কিংবা সহবাসচেতনা।  দৃশ্যমান গল্প আর কাহিনিতে স্নান করে এক অলৌকিক আশ্রয়ের অনুভূতিতে রচিত হয স্নানঅস্তিত্বের সার্থক পঙ্ক্তি যাকে কাব্যের বর্ণাঢ্যনান্দনিকতায় ভাষায় প্রকাশ ঘটে । মানুষের জীবনের আদিম রূপটিই হলো ভাবনা  আর ভাবনা থেকে নেশা- নেশাই আবিষ্কারের মত্ততায় সর্বক্ষণ থাকি সে ভাবনার গভীর মনস্তাত্ত্বিক ইঙ্গিতই প্রকাশ করে কাব্যিক ফর্ম এখান থেকেই লেখার সূত্রপাত !

জীবনকে যেমন নির্দিষ্ট স্ট্রাকচারে নেয়া যায় না - বদলায় তেমনি কাব্যে স্ট্রাকচার স্বভাবে পদ পরির্বতন করে; কোনো বৈচিত্র্যপূর্ণ বাঁেকর দিকে যাত্রা করে এভাবেই কবিতার ফর্মে পরিবর্তন ঘটে । 

লেখকের ধারণা পূর্বপরিকল্পিত নয় -তবে  লেখকের লেখার ধারণা থাকতে পারে আর এই পরিবর্তনশীল ধারণাই নতুনের  দিকে নিয়ে যায় । মনে রাখতে হবে চেতনা  আর আত্নচেতনা এক করে দেখা যাবে না ।    

কবিতার আলো ক্রিয়াশীল হয় অস্থিরচিন্তার বিস্ময়কর ভাবনাবোধে। যেখানে কবি মনন-প্রকৃতির সমন্বয়ে সুষ্টিজগতের সারাৎসার নিয়ে নির্মান করেন কবিতার ক্যানভাস। শব্দে শব্দে আর বোধের নির্যাসে গড়ে ওঠে মনের চিন্তাভূবন-কবির নিজস্ব ভাবনালয়ের নিরাবেগ নিরাকার ভাষ্য-চিন্তার প্রকাশক অথবা রুপকার। জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিগুলো মিলিয়ে নিতে চায়। কবি জীবনের বিবিধ প্রপে র  ডানায় ভর করে পাঠকের চিন্তার দরোজা খুলে দেয়। শূন্যতার অন্ধকারের ভেতর আলোর সন্ধান করেন কবি। দিন ফুরিয়ে গেলে ধীরে ধীরে  অন্ধকার নেমে আসে-এই অস্থায়মান সূর্যের রক্তিম  আলো যখন মেঘের ওপর পড়ে তখন এক অবিশ^াস্য রহস্যময় সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়- এর অবলোকন পৃথিবীর সব কবিই করতে পারেন। অতিন্দ্রিয় সন্ধ্যায় কবি অমর সৌন্দর্যকে সত্য করে তোলেন।


৫.

স্বপ্ন অপার কল্পনা একজন কবিকে বাঁচিয়ে রাখে। সৃষ্টির ভেতর স্বপ্ন আবার স্বপ্নের ভেতর সৃষ্টি যেনো কবির  এক ইন্দ্রজাল যা পাঠকমাত্রই কবির অন্তরে বাঁধা থাকে সম্মোহনের শক্তি নিয়ে। কবি প্রতিদিনের নান্দনিক অভিজ্ঞতাগুলোকে গুলিয়ে নতুন চিন্তার খোরাকে পাঠকের নিয়ামক তৈরি করেন। কবির এই ইন্দ্রজালিক কল্পনামষ্ককতা কাব্যমিথক্রিয়ায় যাদু-বাস্তবতায় রুপান্তিত হয়-আমরা ডাকি ম্যাজিক রিয়ালিজম বলে। সত্যিকার অর্থে ম্যাজিক রিয়ালিজম আদলে একটা সিম্বল বা মিনচিহৃ যা কবি এবং পাঠকের মধ্যে সেতু বন্ধনের অদৃশ্য সুতো। স্বপ্ন আর অতিলৌকিক চিন্তাভাষ্যের ফ্রলো কাব্যে সজিব থাকে জিবিত থাকে এবং প্রাণ পায়-নাহলে কবিতা নিষ্প্রাণ।

দূরের মাঠ, খাঁজকাটা অবারিত প্রান্তর আবার ধূলোধূসরিত গ্রাম অন্যদিকে গ্রাম্যফুল, ঘাসফুল মাড়ানো শিশির,কচিঘাস, সোনালি ধানক্ষেত কিংবা পদ্মাপাড়ের অবারিত কাশফুল, প্রান্তিক অরণ্যে কলমির বেড়াঘেরা মাটির বাড়ি,দূরন্তর হেমন্ত মাঠ,কিছু পরজীবি সোনালুপাতা,উন্মাতাল হাওয়া,কাঁকরফাটা মাটি-পথ,অরণ্যে রে‌্যামান্টিক প্রজাপতি, সূর্যাস্তের বিকেল,গভীর রাতের পাখির ডাক,সাপ,মায়াবি জোনাকি,সাঁওতাল মেয়ে-মাতাল ফুলের গন্ধ সবই আছে-কিন্তু তুমি নেই- সেকি প্রকৃত উপজিব্য কবিতা হবে। এভাবে কবিতা হয় না  কবিতার জন্য তুমি দরকার-তুমি। মনের মানুষ-। কবিতার সাথে রীতিমতো সংসার করতে হয় আর এ সংসারের মালিক হলো মনের মানুষ, মানে প্রেম-কল্পিত মানুষ। প্রত্যেক মানুষের দুটো সংসার থাকে এক ঘর আর এক মনের ঘর- সেটাই হলো কবিতা।

নারীর প্রতি পুরুষের অথবা পুরুষের প্রতি নারীর যে দুর্বার আকর্ষণ প্রকৃতির যে অপার রহস্য-এর ভেতর কবিতা লুকিয়ে থাকে। যেমন ডিমের ভেতর কুসুম আবার ঘুটি পোকার মমির ভেতর , মৌচাকের ভেতর অন্তরিণ যে ঘর তার ভেতর কবিতার বসবাস। কবিতা তো বিনে সুতোর মালা-অদৃশ্যেও যৌবনা ঘোড়া,যে ঘোড়ায় চাপিয়ে সারা পৃথিবী দাপিয়ে বেড়ানো যায়।

ভালোবাসা বিনে কবিতা হয় না-নদীর বাঁকের মতো কবিতা পরির্বতন হয়,হচ্ছে। কবিতাকে অন্ধ ব্যক্তির পথ খোঁজা-আলোর সন্ধানলাভের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। কবিতায় একরকম অনিরুদ্ধ যাত্রা থাকে। কাব্যেও মহাস্রোতে নিজেকে খোঁজা। কবিতা আসলে কী-কবিতা নিয়ে অনেক কথাই বলা যায়-কিন্তু কিছুই করা যায় না। কবিতা মানে তুমি-আমি আমরা সবাই। জগতে বিপুল অন্ধকারেও নেমে আসা নক্ষত্রবিষ্টি আর মুহূর্তের মতো সুন্দর। অনন্ত সুন্দর সৃষ্টিরহস্য-বস্তুত শিল্পির ইজম যেমন নিদির্ষ্ট নয়- তেমন কবিতার বিশ^াস-সত্য-সুন্দর সুস্পর্ষ্ট নয়। কেননা চেতনার সাথে অস্তি¡ত্ববাদ,পরাবাস্তবাদ,রুপকল্পবাদ,স্বপ্নবাস্তবতাবাদ এবং গড়নবাদের অবগাহন বাতাবরনে সৃষ্টি হয় কাব্যের উচ্চতর উপলব্ধি-বিশেষ ক্ষমতাসম্পন চেতনাবোধ যাকে উপলব্ধি দিয়েই উপলব্ধি করতে হয়। আমরা জানি,কবিতার ভাষা এক বিশেষ শ্রেণির ভাষা যার কোনো একাডেমিক রুপ নেই-এটা উপলব্ধির ভাষা-অনুভবের ভাষা, বোধের ভাষা। এই ভাষার কাঠামোয় কাব্যিকশিল্পমান বজায় রাখতে উপমা,উৎপ্রেক্ষা,রুপকল্পে নির্মাণে সৌন্দর্যেও রুপলাভ করে। এক টেকনিকের ভেতর কবি কবিতা সংস্থাপন করেন। আজকের গদ্যরীতি পুরোটাই টেকনিকনির্ভর। কবিতায় পরাবাস্তববাদী বিপ্লব এবং শব্দ ব্যবহারের আধুনিক কলাকৌশল কবিতাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে এসেছে যেখানে সীমিত পরিসরে একটি কবিতা ব্যাপক অর্থ ধারণ করে এবং সেটা নির্ভর করে কবির নিজস্ব দক্ষতার ওপর। 


ব্যক্তিগত উন্মাদনার আশ্রয়ে স্বপ্নময় বিশ্বাসের আমি বার বার কবিতার কাছে ফিরে আসি। ব্যাখ্যাতীতভাবে অন্তস্পোর্শের সংযুক্তির সাথে আমি কবিতার সাথে কথা বলি এবং এর প্রথম সমালোচনার দায়িত্ব পালন করি। 

আমি আসলে কবিতা লিখি না। সময়লিপি রচনা করে চলেছি মাত্র। সেটা কতোটা কাব্যিক আর শিল্পিত তা বিচারে ব্যর্থ হই অতঃপর পাঠকের ঘনিষ্ঠতায় সন্নিকট করি। 

ওগো আমার শানু-প্রাণের কবিতা-আমার আজীবন পাঠ্য-আরাধ্য-জীবনসঙ্গী ওর অন্তরনয়নে আমি চিরকাল বন্দি...

আমার লুৎফা ইভ শাহিন! 




যদি পারো মর্ম ধরি টান দাও এই নির্বোধ উতালাকে


জানি-স্বভাবের গুনে আর প্রকৃতির নিয়মে আমাদের স্বপ্ন সাজাতে ঋতু সোনার পুত্তলি নিয়ে অনন্তর-অগণিত রুপবৈচিত্রের মানবের প্রেমিক- প্রেমিকার হৃদয়মন্দিরে। হায়-এ সময়, ভোরবেলা,দুপুবেলো,সন্ধেবেলা, মেঘভাজা পাতর সরণি জীবনকে র্স্পশ করে মুক্তমহাবাতাসে

আমাদের ডান পাঁজরে লঘু সূর্য তুর্যেওঠা হাওয়া এনে গান গায় ময়ূর নাচিয়ে যায় মনে তথাগত বসন্তের আঙিনায়, সেই মধুব্রজে কে আকাশ বোঝে না আনমনারোদে! হয়তো কখনো কলহাস্যে ফাগুনের উষ্ণ শিহরণ অপ্রাপ্তির ভাবনাগুলোকে এলোমেলো করে দেয়।  হাওয়ার ঘোড়ায় আসিবে আমার প্রেমের কবি আসিবে পাখির ডানায় ভালোবাসার শীতলচাকু দিয়ে সময় কেটে কেটে অপচিত সকল উপমায়-

আমার হৃদয় আজ ঝুলছে তোমার অতলবৃক্ষের ডালে ডালে পাতায় পাতায় আকাশ কাঁপিয়ে তুমি এসে আমাকে নয়নশৃংঙ্খলে জয়ী করবে কবি-

মনেতে বাঘ নিয়ে আমি ফিরি ঘরে-বলে দাও প্রিয় শাদা মেঘ ওড়ে শাদা বক ওড়ে শাদা ঘোড়া ওড়ে নীড়ভাঙা জঙ্গলে!



লুৎফা শাহিন

প্রথম দশকের কবি
প্রকাশিতগ্রন্থ: হৃদয়প্রণিতজোছনা ওড়ে মাহমুহুরিজলে
চকরিয়া সুপার মার্কেট, চকরিয়া, কক্সবাজার